অযত্নেই বাড়ছে রাজশাহীর আম!

32

স্টাফ রিপোর্টার: সুস্বাদু আম বলতেই সবার আগে উঠে আসে রাজশাহীর নাম। বৃহত্তর রাজশাহীর এই আমের খ্যাতি দেশের গন্ডি ছাড়িয়েছে বহু আগেই। দিনে দিনে আম হয়ে উঠেছে কৃষি প্রধান এই অঞ্চলের অর্থনীতির গতি প্রবাহের নিয়ন্ত্রক।

 প্রতি বছর যে আমে এই অঞ্চলে  হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়, সেই আম গাছে বাড়ছে অনেকটা অযত্নে। এর কারণ একটাই-বৈশ্বিক মহামারি করোনা।

স্থানীয় আম চাষিরা বলছেন, অন্য বছর এই সময়ে আম বাগান কয়েকবার হাত বদল হয়ে যায়। কিন্তু করোনার প্রভাবে এখনো অধিকাংশ আম বাগান হাত বদল হয়নি। পরিবহণ ও বাজারজাত শঙ্কায় ফিকে হতে বসেছে এই অঞ্চলের হাজারো আম চাষি ও বাগান মালিকের স্বপ্ন।

তারা বলছেন, গত কয়েক বছরের টানা লোকসানের অনেকেই পুঁজি হারিয়েছেন। এরপরও এবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিলেন চাষিরা। তবে করোনায় সে আশায় গুড়েবালি। ফলে বাগান পরিচর্যায় বাড়তি অর্থলগ্নি করতে চাইছেননা মালিকরা। এতে অনেকটাই অযত্নে বাড়ছে আম। 

সাধারণ চাষিদের চেয়েও খারাপ অবস্থা রপ্তানীর উদ্দেশ্যে আম চাষিদের। বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে আম রপ্তানী নিয়েও শঙ্কায় তারা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ম্যাঙ্গ প্রডিউসার কো অপািরেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খান শামীম বলেন, আম রপ্তানীকারকদের সাথে তাদের ২০ জন রপ্তানীগঞ্জ আম উৎপাদনকারীর চুক্তি হয়েছে। 

কিন্তু করোনা সংকটের ফলে এখন রপ্তানীকারকরা তাদের এড়িয়ে চলছেন। অনেক চেষ্টার পরও তাদের নাগাল পাচ্ছেন না চাষিরা। এই পরিস্থিতিতে আম রপ্তানী নিয়ে চরম শঙ্কা তৈরী হয়েছে। অনেকেই বাগান পরির্যা বাদ দিয়েছেন বলেও জানান এই আম চাষি।

একই ভাষ্য রাজশাহী এগ্রো ফুড প্রডিউসার সোসাইটির আহবায়ক আনোয়ারুল হক বলেন, দেশে এখন নিরাপদ রপ্তানীযোগ্য প্রচুর আম উৎপাদন হচ্ছে। বিদেশে এর চাহিদাও রয়েছে প্রচুর। করোনা প্রেক্ষিতে ফলের চাহিদা বাড়ায় তৈরী হয়েছে নতুন বাজার। আমাদের এই সুযোগ কাজে লাগোতে হবে। কবে করোনার কারণে আমের বিশ্ববাজার হারানোর শঙ্কা নেই বলে জানান তিনি।

জেলা প্রাশনের বেধে দেয়া সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী ১৫ মে থেকে একে একে বাজারে উঠবে ফলের রাজা আম।  তিনি রপ্তানী নিয়ে আমরা এ বছর আশঙ্কায় আছি। যারা রপ্তানি করেন তাদের কারো সাথে আমাদের এবার চুক্তি হয়ননি তারাও আমাদের সাথে যোগাযোগ করেননি।

তবে এই পর্রিস্থিতিতে কোনভাবেই আম বাগান পরিচর্যা ছেড়ে দেয়া যাবেনা বলে আম চাষি ও বাগান মালিকদের পরামর্শ দিয়েছেন বারির উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ফল বিভাগের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরফ উদ্দিন। 

তিনি বলেন, করোনার কারণে দেশে বাইরে থেকে বিভিন্ন ধরণের ফল আমদানি বন্ধ রয়েছে। আমাদের দেশের মানুষ আম বেশি পছন্দ করেন। কাজেই আম রপ্তানি না করা গেলেও দেশেই বাজারজাত করা যাবে। চাষিদের উচিৎ না না ছেড়ে আম যে পর্যন্ত গাছে আছে, সেই পর্যন্ত পরিচর্যা করা উচিত। 

 এই আম গবেষক আরো বলেন, আম বাজাররে প্রচুর লোকের সমাগম হয়। করোনা সংক্রমণ এড়াতে আম বাজারগুলোর পরিসর বাড়িয়ে দিতে হবে। যাতে  ক্রেতা-বিক্রেতারা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে কেনাবেচা করতে পারেন। এই ঘোষণা আগেভাগেই দেয়া জরুরী।

তিনি আরো বলেন, ঢাকা-নারায়নগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আম কিনতে প্রচুর লোকের সমাগম হয় রাজশাহী অঞ্চলে। ক্রেতাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। 

আম নিয়ে কোনভাবেই ভীতি ছড়ানোর যাবেনা বলে উল্লেখ করে ড. শরফ উদ্দিন বলেন, বিভিন্ন সময় কেমিক্যাল মেশানো আম নষ্টের খবর গণমাধ্যমে। এমন খবরে আমে আগ্রহ হারাচ্ছে লোকজন। করোনা পস্থিতিতে এমন খবর জনমনে আরো আতঙ্ক ছড়াতে পারে। ফলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নীরিক্ষা ছাড়া কোন ভাবেই চাষির আম নষ্ট করা যাবে।

জানতে চাইলে রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মককর্তা ড. আলীম উদ্দিন বলেন, এখনো তেমন বড় ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেই। আম পরিমাণে কম থাকলেও বাড়তি রয়েছে ভলো। আশা করা যাচ্ছে এবার ফলনও বেশ ভালোই হবে। কিন্তু সঙ্গত কারণেই আম নিয়ে এবার চাষিরা গভীর উদ্বেগের মধ্যে আছেন। তার আশা কৃষিপণ্য হিসেবে সরকার আম ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখবে। 

ড, আলীম উদ্দিনের মতে, এবার আম নিয়ে সবচেয়ে বড় সংকট হতে পারে পরিবহণ এবং বাজারজাতকরণ।  এ ক্ষেত্রে  কাজে লাগানো যেতে পারে রেল। আম পরিবহণের জন্য রাজশাহী-ঢাকা বিশেষ ট্রেন চালু করা যেতে পারে। এতে চাষির লোকসান কমবে। 

পরিপক্ক আমে পচন রোধে হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট দেয়ার তাগিদ দিয়েছেন ড, আলীম উদ্দিন। তিনি বলেন, চাইলে যে কেউ নিজ বাড়িতেই আম হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে আম গাছ থেকে নামানোর পর ৫৫ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড তাপমাত্রায় গরম পানিতে  সর্বোচ্চ ৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে। এতে আমের জন্য ক্ষতিকর সবধরণের জীবানু মারা পড়বে।

এই প্রযুক্তি আমের পচন ও পাকা ঠেকাবে ৫ থেকে ৭ দিন।  কুরিয়ারে আম পরিবহণের ক্ষেত্রে এটি বড় প্রাপ্তি। আম বাজার ঘিরে স্বাস্থ্য ঝুঁকিরি বিষয়টি মাথায় রাখছে স্বাস্থ্য দপ্তর। রাজশাহীর বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক ডা. গোপেন্দ্র নাথ আচার্য্য জানান, আম বাজারে করোনা সংক্রমণ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জন। তাদের এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। 

তিনি বলেন, বাইরে থেকে আমের মৌসুমে বিপুল সংখ্যক ক্রেতা রাজশাহী অঞ্চলে আসেন। যারা করোনার উপসর্গ নিয়ে আসবেন তাদের অবশ্যই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। তবে আম বাজার কেন্দ্রিক মেডিকেল টিম গঠন হয়সি এখনো। বিষয়টি নিয়ে তারাও ভাবছেন।

আঞ্চলিক কৃষি দপ্তরের হিসেবে, রাজশাহী অঞ্চলে এবছর আম বাগান রয়েছে সবমিলিয়ে ৮০ হাজার ৩৬০ হেক্টর। এ থেকে উৎপাদন হতে পারে ৯ লাখ ৬৮ হাজার ৭৭০ টন আম। গত বছর ৭২ হাজার ৯০৯ হেক্টর আম বাগান থেকে আম উৎপাদন ছিলো  ৮ লাখ ২৮ হাজার ৬৭৮ টন।

 সূত্র বলছে, বিভাগে সবচেয়ে বেশি আমবাগান রয়েছে আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এই জেলায় ৩০ হাজার ৩৫ হেক্টর আম বাগান থেকে এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৯ হাজার টন আম।

 এবার সবেচেয়ে বেশি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে নওগাঁয়।  বরেন্দ্রখ্যাত এই জেলায় ২৪ হাজার ৭৭৫ হেক্টর আম বাগান থেকে এবার আম উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ২১ হাজার ৫৩৯ টন।

 এছাড়া রাজশাহীতে ১৭ হাজার ১৭ হাজার ৬৮৬ হেক্টর বাগানে ২ লাখ ১০সহাজার ৯৪৭ টন এবং নাটোরে ৪ হাজার ৮৬৪ হেক্টরে ৬৭ হাজার ২৮৪ টন আম উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যথেষ্ট প্রস্তুতি সত্ত্বেও রাজশাহী থেকে আম রপ্তানি হচ্ছে সামান্যই। গত বছর রাজশাহী জেলা থেকে ৩৬ দশমিক ৪৪৭ টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে ৬৪ দশমিক ৪৫ টন আম রাপ্তানি হয়। এবার তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আম রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। 

আপনার মন্তব্য