এক নির্বাচনের আগে পাম্প, আরেক নির্বাচনের পর পানি!

14
এক নির্বাচনের আগে পাম্প, আরেক নির্বাচনের পর পানি!

স্টাফ রিপোর্টার: তিন কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয়টি পানির পাম্প বসিয়েছে রাজশাহীর কাঁকনহাট পৌরসভা। সেও প্রায় ৫ বছর আগে। কিন্তু এতোদিনেও পৌরবাসীর মাঝে পানি সরবরাহ করতে পারেনি পৌর কর্তৃপক্ষ। এতে দুর্ভোগের অন্ত নেই পৌরবাসীর।

স্থানীয়রা বলছেন, গত ভোটের আগে তড়িঘড়ি করে এসব পাম্প বসান মেয়র। কিন্তু গড়ে তোলা হয়নি পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক। ফলে দীর্ঘদিনেও কাংক্ষিত এসব পাম্প কাজে আসেনি পৌরবাসীর।

অভিযোগ উঠেছে, পৌর মেয়র আবদুল মজিদের অনিয়ম ও স্বেচ্ছ্বচারিতায় বন্ধ রয়েছে এসব পানির পাম্প। উল্টো বিশ্বব্যাংকের ঋণের বোঝা বাড়ছে।
২০ দশমিক ৫ বর্গ কিলোমিটার আয়োতনের এই পৌরসভায় বাস ১৮ হাজার ৫১৫ জনের। যাদের ১০ হাজার ২৫৭ জন ভোটার।

২৬৪টি টিউবওয়েলে একসময় খাবার পানি পেতেন পৌরবাসী। বরেন্দ্র এলাকার এই পৌরসভার পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় একে একে অকেজো হয়ে পড়ে নলকূপগুলো। অধিবাসীদের পানীয়জলের বন্দোবস্ত করতে বিশ্বব্যাংক ও জলবায়ু তহবিলের অর্থায়নে ৭ টি গভীর নলকুপ বসানো হয়। কিন্তু এসব গভীর নলকূপ চালু হয়নি ৫ বছরেও।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর কাঁকনহাট পৌরসভার সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর আগেই স্থাপন করা হয়ে নলকূপগুলি। ভোটের আগে মেয়র আবদুল মজিদ পৌরবাসীকে কথা দিয়েছিলেন-তিনি নির্বাচিত হলে পাইপলাইনে সুপেয় পানি পৌঁছে দেবেন বাড়িবাড়ি।

কিন্তু হ্যাট্রিক মেয়র নির্বাচিত হয়েও কথা রাখেননি মেয়র আবদুল মজিদ। ট্রায়াল শেষে বন্ধ ফেলে রাখেন পানির পাম্পগুলো। গত ৫ বছরেও তালা খোলেনি পাম্প হাউসের।

পৌর কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, পৌরসভার সেরাপাড়া, সুন্দলপুর, কাঁকনহাট স্টেশনপাড়া, কাঁকনপাড়া, মহাদেবপুর ও ব্রাহ্মনগ্রাম মহল্লায় ছয়টি পাম্প বসানো হয়। একই সাথে নির্মাণ করা হয় পানি সংরক্ষণের বৃহদাকার ট্যাঙ্ক।

সরেজমিনে গিয়ে প্রতিটি পাম্প তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও পাম্পগুলো ঢেকে গেছে ঝোঁপ জঙ্গলে। দীর্ঘদিন অকার্যকর পড়ে থাকায় কোটি টাকায় কেনা এসব পাম্প নষ্টের শঙ্কা করছেন লোকজন।

বন্ধ এসব পাম্প চালুর উদ্যোগ না নিয়ে পৌর এলাকার কিছু এলাকায় সাবমার্সিবল পাম্প বসানো হয়েছে। এতে কিছু এলাকার পানীয়জলের সংকট দূর হলেও বেশিরভাগ এলাকায় সংকট রয়ে গেছে আজো।

কাঁকনহাটপাড়ায় ডা. আকবর আলীর বাড়ির সামনে বসানো হয়েছে এই প্রকল্পের একটি পাম্প। তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা পাম্প হাউসটি ঢেকে গেছে ঝোঁপ-জঙ্গলে। পাম্পটি সচল না থাকলেও পাম্প হাউজের উপরে খড়ের স্তুপ করা হয়েছে।

পাম্পের পাশের বাড়িটি ফেরদৌসি বেগমের। তিনি জানালেন, গত নির্বাচনের আগে এটি বসানো হয়েছে। কিন্তু এতোদিনেও সেটি চালু হয়নি। তারা আশা করেছিলেন, পাম্প বসলে অন্তত খাবার পানি পাবেন। পাম্প চালু না হওয়ায় সেই আশায় গুড়েবালি। প্রায় এক কিলোমিটার দূরে মাঠের মধ্যে থাকা সেচের গভীর নলকূপ থেকে তাদের খাবার পানি নিতে হয়।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তারা পৌরসভায় বাস করছেন, একটা গরু-মুরগি পাললেও কর দিচ্ছেন। কিন্তু খাবার পানিটুকুও পাচ্ছেননা। এবিষয়ে মেয়রের নজর নেই বলেও অভিযোগ করেন এই নারী।

প্রতিবেশী এই নারীর সুরে সুর মেলান একই এলাকার বাসিন্দা ডা. আকবর আলী। তিনি বলেন, কোন ধরণের পরিকল্পনা ছাড়াই পাম্পগুলো বসিয়েছে পৌরসভা। তাদের পানি সরবরাহের কোন নেটওয়ার্ক নেই। বিষয়টি বিভিন্ন সময় বৈঠকে মেয়রের নজরে আনলেও কোন ফল পাননি তারা। ফলে বাধ্য হয়ে কেউ কেউ নিজস্ব পাম্প বসিয়ে পানির ব্যবস্থা করেছেন।

পৌর এলাকার কাঁকনহাট স্টেশন পাড়ায় বসানো হয়েছে আরেকটি পাম্প। সেখানকার বাসিন্দা খোরশেদ আলম জানান, ৫ বছর আগে ট্যাঙ্কসহ এই পাম্প বসিয়েছে পৌরসভা। আমরা শুনে আসছি, যে অর্থ বরাদ্দ ছিলো সেই অনুযায়ী কাজ হয়নি। টেস্টিংকালে যে পরিমাণ পানি ওঠার কথা-সেই পরিমাণ ওঠেনি। এনিয়ে এলাকার লোকজন অভিযোগ দেয়ায় বন্ধ রয়েছে পাম্প।

ওই এলাকার এক গৃহবধূ জানান, স্টেশনে একটি টিউবয়েল ছিলো। আগে সেটি থেকে তারা খাবার পানি নিতেন। এক পর্যায়ে সেটিতে মোটর সংযোজন করে নিজেদের সংরক্ষিত এলাকায় নেন স্টেশন মাস্টার। এরপর থেকে তারা পাশের মসজিদ থেকে খাবার পানি নেন। কখনো কখনো মসজিদেও পানি পাননা। তারা পাশের সেচের গভীর নলকূপ থেকে পানি নেন। পানি নিয়ে তাদের দুর্ভোগের অন্ত নেই।

এদিকে, পৌর মেয়র আবদুল মজিদের বিরুদ্ধে পৌরসভায় নলকূপ প্রকল্প, গভীর নলকূপ প্রকল্প ও পানি নিষ্কাশন প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ তছরুপের একাধিক অভিযোগে পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে।

বিয়ষটি স্বীকার করেছেন পৌর মেয়র আবদুল মজিদ। তিনি দাবি করেন, জনগুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প নিয়ে দুদকে অভিযোগ দেয়া হলে বিশ্বব্যাংক চিঠি দিয়ে প্রকল্পটির কাজ আটকে দেয়। দীর্ঘ দুই বছর পর দুদক তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পায়নি। এখন তিনি প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে চান। আগামী নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করলে এই প্রকল্পের সুফল জনগণ পাবেন বলেও জানান মেয়র।

অকার্যকর গভীর নলকূপ প্রকল্পে পৌরসভার ঋণের বোঝা বাড়ছে কি-না জানতে চাইলে মেয়র বলেন, এতে অর্থায়নের প্রায় ১৫ শতাংশেরমত ঋণ। সেটি টাকার অংকে তা কত সেটি তিনি এই মুহূর্তে জানাতে পারছেননা। প্রকল্প বাস্তবায়নে তার কোন দায় নেই বলেও দাবি করেন মেয়র আবদুল মজিদ।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০২ সালে পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর প্রশাসকের দায়িত্বপালন করেন আবদুল মজিদ। এর পরের তিনটি নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন তিনি।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, মেয়র আবদুল মজিদ গরহাজির পৌরসভায়। তিনি ঢাকায় থাকেন মাসের অধিকাংশ সময়। পরিষদে গিয়েও দেখা পান না নাগরিকরা। বাস্তবে নেই, তিনি কাজ করছেন কাগজে কলমে।

এনিয়ে পৌরসভার একাধিক কাউন্সিলরের সাথে প্রকাশ্য বিরোধেও জড়িয়েছেন মেয়র। তবে বরাবরই অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে আসছেন মেয়র।

আপনার মন্তব্য