এসআইয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় জীবন বরবাদ

106
এসআইয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় জীবন বরবাদ

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানার উপপরিদর্শক উত্তম কুমার রায়কে নিজের ভাইয়ের চেয়েও বেশিকিছু ভাবতেন ফয়সাল রহমান ওরফে তুষার (২৮)। অথচ তুষারকেই বার বার টার্গেট করেছেন এসআই উত্তম। পুলিশের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তার জীবন বরবাদ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছে পরিবার।


অন্তত আটবার তাকে ধরে নিয়ে গেছেন থানায়। প্রত্যেক দফায় তার পরিবারের কাছ থেকে মোটা অর্থ আদয়ের অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ গত ২৪ আগস্ট তুষারকে মাদকের মাদকের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। মামলাটির বাদি এসআই উত্তম কুমার রায়। ওই মামলায় এখনো রাজশাহী কারাগারে রয়েছে এই যুবক।

ভুক্তভোগী তুষার নগরীর তালাইমারী শহিদ মিনার এলাকার মৃত গোলাম মোস্তফার ছেলে। তার বাবা পেশায় বাস চালক ছিলেন। চরম আর্থিক অনটনে পড়ে সংসার চালাতে শেষে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ নেন গোলাম মোস্তফা।

সূত্র বলছে, নগরীর শীর্ষ মাদক সম্রাজ্ঞি কমেলার বাড়ির পাশেই সর্বশেষ ‘হেয়ার স্টাইল’ নামে সেলুন চালাতেন তুষার। সম্প্রতি সড়ক সম্প্রসারণ কাজ শুরু হলে তার দোকানটি ভাঙা পড়ে। পরে ফুটপাতের উপরেই বসতেন তুষার। কমেলাকে জিম্মি করতেই তুষারকে সোর্স বানাতে চেয়েছিলেন উত্তম।

রাস্তার বাম পাশে মাদক সম্রাজ্ঞি কমেলার বাড়ি। ডান পাশে শিশু গোরস্তান। দিনে দুপুরে এখানে মাদকের কারবার চলে।

পরিবারের ভাষ্য, তুষারকে প্রথমে সোর্স হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব নেন এসআই উত্তম। কিন্তু তাতে রাজি হননি তুষার। এরপর থেকেই প্রায় দুই মাস পর পর তাকে ধরে নিয়ে টাকা আদায় করে ছেড়ে দিতেন উত্তম। টাকা দিতে না পারায় এনিয়ে চার বার মামলা দিয়ে আদালতে চালানও দিয়েছেন। এই ঘটনার প্রতিকার চায় পরিবার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিন বোনের পর তুষার। তার ছোট আরেক ভাইও রয়েছে। সাত বছর বয়সি তার এক কন্যা সন্তানও রয়েছে। একসময় পাড়ার মোড়ে কনফেশনারীর দোকান ছিলো তুষারের। ভাই নগরীর একটি জুয়েলার্সের কারিগর। মা ফরিদা বেগম এলাকায় কুরআন শেখাতেন। দুই ছেলের আয়ে ভালোই চলছিলো সংসার স্বামী হারা ফরিদা বেগমের।

স্বজনরা জানান, পরিচয়ের সূত্র ধরে এসআই উত্তম এসে তুষারকে সোর্স হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু শত্রু বেড়ে যাবার শঙ্কায় তুষার সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। এর কয়েক দিনের মাথায় দোকানের সামনে কয়েক পিস ইয়াবা রেখে তাকে ধরে নিয়ে যান এসআই উত্তম। এরপর থেকে বিভিন্ন সময় তাকে ধরে নিয়ে যান ওই এসআই। প্রত্যেক বারই ১৫ থেকে ২০ হাজার করে টাকা নিয়েছেন।


এসআই উত্তমকে নিয়মিত টাকা দিতে গিয়ে তার কনফেকেশনারীর দোকান উঠে গেছে। স্বামীকে ছাড়িয়ে আনতে গয়না বন্ধক রেখেও উত্তমকে টাকা দিয়েছেন তুষারের স্ত্রী মিতু রহমান রিমা।

মাদকের মামলায় জড়িয়ে এক পর্যায়ে চরম বিপর্যয় নেমে আসে সংসারে। ভাগ্য বরণ করে স্ত্রী-সংন্তান নিয়ে আলাদা সংসার শুরু করেন তুষার। সংসারের চাকা সচল রাখতে শেষে সেলুন খুলে বসেন।

তালাইমারী শহীদ মিনার সংলগ্ন এই গলির প্রবেশ মুখে সেলুন ছিলো তুষারের। সড়ক সম্প্রসারণ কাজের জন্য সেটি সরিয়ে নিতে হয়। এই গলি দিয়ে মাদক সম্রাজ্ঞি কমেলার বাড়িতে যাতায়াত করেন লোকজন।

তাতেও বাগড়া দেন এসআই উত্তম। দিনে দুপুরে ধরে নিয়ে গিয়ে মামলা দিয়েছেন। এখন আর টাকা দেয়ার সামর্থ নেই তুষার ও তার পরিবারের। তাই ছাড়িয়ে আনতে পারেননি উত্তমের কব্জা থেকে।

তুষারের মা ফরিদা বেগম জানান, আমার দুই ছেলে। তারা কেউই মাদক কারবারে যুক্ত নয়। তিনি এলাকায় কুরআন শিক্ষা দেন। দুই ছেলে টুকটাক কাজ করে সামান্য আয় রোজগার করে সংসার চালায়। কিন্তু বার বার এসআই উত্তম বড়ছেলে তুষারকে ডেকে নিয়ে গিয়ে মামলায় ফাঁসিয়েছে।

ফরিদা বেগমের ভাষ্য, প্রথম দিকে এসআই উত্তমের সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিলো। তাকে পুলিশের সাথে আমরা মিশতে বারণ করতার। তুষার বলতো, উত্তম আমার ভাই। তিনি আমাকে দেখে রাখবেন। এটা তার দেখে রাখার নমুনা। পুলিশকে বিশ্বাস করে মামলার ঘানি টানছে তুষার।

মা আরো জানান, বোয়ালিয়া থানার অধিকাংশ পুলিশ অফিসারের নিয়মিত চুল কেটে দিতো তুষার। ফোন করে ডেকে নিতো তাকে। কাজ না থাকায় ইদানিং সে শুয়ে-বসেই সময় কাটাতো। উপায় না দেখে তার বউ ক্লিনিকে চাকরি নেয়। সে মাদক কারবার করলে ভাঙাচোরা কুঁড়েঘরে বাস করতে হতোনা।

নগরীর রাণীনগর পানি শোধনাগার এলাকার এই মোড় থেকে দুপুরের দিকে তুষারকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশের একটি দল।

তুষারের স্ত্রী মিতু রহমান রিমা জানান, সোর্স না হতে চাওয়ায় তার স্বামীকে বার বার ফাঁসিয়েছেন এসআই উত্তম। তিনি তাকে ছয় বারে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা করে দিয়েছেন। সর্বশেষ নিজের গয়না বন্ধক রেখে এসআই উত্তমকে ১৬ হাজার টাকা নিয়েছেন। তিনি এখনো সেই গয়না তুলতে পারেন নি। কখনো তুলতে পারবেন কি না তাও নিশ্চিত নন। তার সব স্বপ্ন ফিরে হয়ে গেছে।

রিমা আরও জানান, এসআই উত্তম তার স্বামীকে বাইরে পেলেই ধরে নিয়ে যেতেন। অন্তত দুই মাস পর পর তাকে ধরে নিয়ে যেতেন উত্তম। প্রত্যেকবার ধরে নিয়ে যাবার পর সরাসরি তাকেই ফোন দিনের এসআই। তিনি নিজে টাকা নিয়ে গিয়ে স্বামীকে ছাড়িয়ে আনতেন। একে একে চারবার মাদকের মামলা দিয়েছেন। এনিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুললে আরো মামলা দেয়ারও হুমকি দিয়েছেন এসআই উত্তম। এই ঘটনার পর চরম নিরাপত্তাহীনতায় তারা।

আদালতে দাখিল করা মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এসআই উত্তম এএসআই মনিরুল ইসলামসহ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে গিয়ে ২৩ আগস্ট দিবাগত রাত ১০টা ৫০ নিমিটে নগরীর রাণী নগর সিটি হাসপাতালের সামনে থেকে গ্রেফতার করেন তুষারকে।

তার কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা মূল্যের ৭ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের কথা উল্লেখ করে পুলিশ। গোপন সংবাদ পেয়ে ওসিতে অবহিত করে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে পাকড়াও করেন এসআই উত্তম।

ভিকটিম ফয়সাল রহমান তুষার (২৮)

তবে প্রত্যক্ষদর্শী কয়েজন এলাকাবাসী বলছেন, ওই দিন রাতে নয়, বেলা আনুমানিক ২টার দিকে সিটি হাসপাতালের সামনেকার পানি শোধনাগারের পাশের মোড় থেকে তাকে ধরে নিয়ে যান দুই পুলিশ সদস্য। কারণ ছাড়াই অন্য এক যুবকে ধরে নিয়ে যাবার প্রাক্কালে প্রতিবাদ করায় তাকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। ওই সময় সেখানে এসআই উত্তম ছিলেন না।

এদিকে, অনুসন্ধানে জানা গেছে, তালাইমারী শহীদ মিনার এলাকায় সিভিলে সবসময় ঘোরেন বোয়ালিয়া থানার এসআই উত্তম কুমার রায়। দীর্ঘ আট বছর ধরে একই থানায় দায়িত্বপালন করছেন তিনি। তার সিভিল টিমে রয়েছেন থানার এএসআই মনিরুল ইসলাম, কনস্টেবল তৌহিদুল ইসলাম (কং ১৯৩৫) ও কনস্টেবল অলক কুমার (কং ১৬৪৮)।

এই দলের প্রধান টার্গেট মাদক ব্যবসায়ী কমেলা। কিন্তু তারা কমেলাকে গ্রেফতার করেননা। যারা তার কাছে মাদক নিতে আসেন তাদের পাকড়াও করে অর্থ হাতিয়ে নেয় পুলিশের এই দলটি।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, এলাকায় রয়েছে এসআই উত্তমের এক ডজন সোর্স। যাদের প্রত্যেকেই মাদক ব্যবসায় জড়িত। নিজেদের বাঁচাতে এরা সোর্স হিসেবে কাজ করছেন। এরই ঘুরে ফিরে পুলিশের ফিটিং মামলার সাক্ষি হন।

যারা তার প্রস্তাবে রাজি হননি তাদের জীবন মামলায় মামলায় বরবাদ করে দিয়েছেন। এছাড়া সাজানো মামলায় ফাঁসিয়ে এলাকার নিরিহ লোকজনের জীবনও দুর্বিসহ করে তুলেছেন এসআই উত্তম।

ছেলের মুক্তি এবং অভিযুক্ত এসআই উত্তম কুমার রায়ের শাস্তি দাবি করেন ভুক্তভোগী তুষারের মা ফরিদা বেগম।

এই তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে, ফয়সাল রহমান তুষার গ্রেফতার মামলার অনুসন্ধানে নেমে। মামলাটির দুই সাক্ষি হাদির মোড় নদীর ধার এলাকার সুরুজ আলীর ছেলে শুভ (২৫) এবং একই এলাকার জামিল হোসেনের ছেলে মিদুল (২০)। এরা দুজনেই দীর্ঘদিন ধরে এসআই উত্তমের সোর্স হিসেবে কাজ করেন। তারাও মাদক কারবারে যুক্ত বলে জানিয়েছেন এলাকার লোকজন।

জানতে চাইলে শুভ জানান, তিনি এসআই উত্তমের একাধিক মামলার সাক্ষি। যখন তিনি ডাকেন, নিজে গিয়ে সাক্ষ্য দেন। আবার কখনো কখনো তাকে রাস্তায় পেয়ে যায় পুলিশ। অ্ন্যরা কেউ সাক্ষ্য দিতে রাজি না হলেও তিনি রাজি হন। তবে তুষারকে তিনি মাদকসহ আটক করে নিয়ে যেতে দেখেছেন। তিনিও দাবি করেন রাতেই তাকে মাদকসহ তার সামনে থেকে ধরেছে পুলিশ।

তবে অভিযান বিষয়ে কোন বক্তব্য নেই মামলার অপর সাক্ষি মিদুলের। তিনি জানান, ওই অভিযানে অংশ নেয়া থানার কনস্টেবল তৌহিদুল ইসলাম তার বড়ভাই। তিনি ভাইয়ের সাথেই ঘোরেন। ভাইয়ের নির্দেশেই তার সবগুলো মামলার তিনি সাক্ষি হয়েছেন। এটির বেলাতেও তা-ই ঘটেছে।

জানতে চাইলে মিদুল তার ভাই নন বলে দাবি করেছেন কনস্টেবল তৌহিদুল ইসলাম। তাকে কখনোই তিনি অভিযানে নিয়ে যাননি। তার এই দাবির সত্যতাও নেই বলে দাবি করেন কনস্টেবল তৌহিদুল ইসলাম।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই উত্তম কুমার রায় বলেন, ৭ গ্রাম হেরোইনসহ তুষারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি নিজেই তাকে গ্রেফতার করেছেন। দুপুরে নয়, তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে রাতে। পরে বিধি মেনে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তিনি নিজে বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেছেন।

অভিযুক্ত এসআই (নিরস্ত্র) উত্তম কুমার রায় (বিপি ৮৬০৫০৯৯১৪৯)

এসআই উত্তম দাবি করেন, তুষার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে মাদকের একাধিক মামলা রয়েছে। এর আগে বহুবার তিনি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। তিনি নিজেও তাকে কয়েকবার গ্রেফতার করেছেন। গ্রেফতার করে তুষারের পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেয়ার অভিযোগও ভিত্তিহীন দাবি করেন উত্তম। একই সাথে যা হয়েছে থানার ওসিকে জানিয়েই হয়েছে বলে দাবি করেন।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই উত্তম কুমার রায়ের সুরেই কথা বলেন বোয়ালিয়া মডেল থানার ওসি নিবারণ চন্দ্র বর্মন। তিনি বলেন, তুষার একজন মাদকবেসী। তিনি মাদক ব্যবসাও করেন। তার বিরুদ্ধে মাদকের একাধিক মামলা রয়েছে। পুলিশ তাকে হাতেনাতে মাদকসহ গ্রেফতার করে। তিনি নিজেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।

এমটি তিনি নিজেও দাবি করছিলেন। আসলে এটি তার কৌশল। পরে মাদকের মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
এসআই উত্তমের আটক বাণিজ্যের অভিযোগ বিষয়ে ওসি বলেন, ওই এসআইয়ের বিরুদ্ধে টাকা নেয়ার এমন অভিযোগ তুষারের পরিবার থেকে কখনো আসেনি। তবুও অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি যোগ করেন, তুষার পুলিশের সোর্স হিসেবেও কাজ করেছেন। কিন্তু তাই বলে তার মাদক কারবারের সুযোগ নেই। যার কাছে মাদক পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। এনিয়ে কাউকে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।

অন্যেদিকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনত ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন নগর পুলিশের মুখপাত্র গোলাম রুহুল কুদ্দুস। এই ঘটনায় কোন পুলিশ সদস্যসের সম্পৃক্ততা পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথাও জানান তিনি ।

আপনার মন্তব্য