করোনার প্রভাব মোকোবেলায় বিশেষ গুরুত্ব কৃষিতে

9
বিশ্বের ৪১তম বৃহত্তম অর্থনীতি বাংলাদেশ

জাতীয় ডেস্ক: বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবেলায় বোরো পরবর্তী কৃষিকে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ জন্য আউশ ধান, হাইব্রিড ধান, পাট, শাক-সবজি, ডালজাতীয় শস্য ও ফলমূল আবাদে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। 

কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, বাজারজাতকরণ ও বিপণনে গুরুত্ব দিয়ে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। করোনার কারণে যেন খাদ্য সংকট না হয়, দেশে যেন দুর্ভিক্ষের মতো কোনো অবস্থা সৃষ্টি না হয়, মানুষ যেন খাদ্য কষ্টে না ভোগে, সেজন্যই এসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি উদ্যোগে সবচেয়ে বড় অর্থায়ন করে থাকে বাংলাদেশ পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। সংস্থাটির পক্ষ থেকে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে দেশে কৃষি খাতে করোনা পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ইতোমধ্যে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। সেখানে করোনা সংক্রমণের ফলে মার্চ-এপ্রিল মাসের কৃষি খাতের সংকটের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, ‘আগামী জুন থেকে আগস্ট এই সময়ে কৃষির বিপদের প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে। দেশের সামগ্রিক খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব পড়তে শুরু করবে। ফলে সম্ভাব্য ওই প্রভাব মোকাবিলায় সরকারকে এখনই করণীয় ঠিক করতে হবে।’

করোনা পরিস্থিতির কারণে সারাবিশ্বে খাদ্য সংকট দেখা দেয়ার একটা আভাস পাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, করোনা পরিস্থিতির দ্বারা খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা আক্রান্ত হওয়া মানে বাঁচা-মরার আরেক সংকটের মুখোমুখি হওয়া। এ কারণে কৃষির ওপর করোনা পরিস্থিতির প্রভাব সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ বা উত্তরণের জন্য করণীয় নির্ধারণ করতে হবে এবং তা করতে হবে এখনই। কেননা, বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ইতোমধ্যেই করোনা পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্ব খাদ্য পরিস্থিতির হালহাকিকত সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে।

এসব কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার দেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলছেন, এক ইঞ্চি জমি যেন পড়ে না থাকে। যে যেভাবেই পারেন প্রতিটি ইঞ্চি জায়গার সদ্ব্যবহার করবেন। বাড়ি উঠানে, আশপাশে তরিতরকারি, ফল-মূলের গাছ লাগালেও পরিবারের কাজে লাগবে। অনেকে বিক্রি করে কিছু পয়সার মুখ দেখবেন। এ ছাড়া কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য প্রধানমন্ত্রী কৃষিমন্ত্রীকেও বিশেষভাবে নজরদারি করতে বলেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন খাদ্যে উদ্বেৃত্ত দেশ। তারপরেও বসে থাকলে চলবে না। করোনার কারণে অনেক দেশ সংকটে পড়বে। আমাদের থাকলে আমরা যেন তাদের সহযোগিতা করতে পারি। বোরো ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জমি ফেলে না রেখে পরবর্তী ফসল কীভাবে ফলাতে হবে কৃষিমন্ত্রীকে সেই তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী।

কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, বোরো ধানের পর প্রতিবারই আউশ ধান উৎপাদনের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়। এবার সেই পদক্ষেপ আরও জোরোশোরে নেয়া হয়েছে। আউশ ধানের বিষয়ে সাধারণত প্রতিবছর ৩০ লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এবার আসন্ন মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা হলো ৩৫ লাখ টন। সেজন্য আসন্ন আউশ মৌসুমে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সেচের রেট ৫০ শতাংশ হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং ৬ হাজার ৫০০ টন হাইব্রিড ও উফশি জাতের বীজ ইতোমধ্যে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।

বগুড়ার ধুনট উপজেলার চরপাড়া গ্রামের কৃষক আকিমুদ্দিন শেখ জানান, বোরো ধান কাটার পরপরই আউশ ধান আবাদ করার জন্য অনেকেই বীজতলা তৈরি করে বীজ ফেলেছেন। ধান কাটা শেষ হওয়ার পর জমি চাষ দিয়ে সাথে সাথে আউশ ধান চাষ করা হবে। আউশ ধানসহ পাট, গ্রীষ্মকালীন টমেটো, সবজি ও অন্যান্য ফসল আবাদ করার জন্য স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে তাগাদা দেয়া হচ্ছে। কৃষি অফিসাররা ফোন করেও কৃষকের খোঁজখবর নিচ্ছেন।

কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে চাষযোগ্য প্রতি ইঞ্চি জমিতে ফসল ফলানোর প্রয়োজণীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ৬ হাজার ৫০০ টন হাইব্রিড ও উফশি জাতের বীজ ইতোমধ্যে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। করোনাকালীন সাধারণ ছুটির সময় কৃষি কার্যক্রম সক্রিয় রাখতে কৃষি মন্ত্রণালয়াধীন কর্মকর্তাদের নিজ কর্মস্থলে থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মাঠে গিয়ে এ দুর্যোগময় অবস্থায় কৃষকের সাথে, কৃষকের পাশে থাকতে বলা হয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার কৃষকদের স্বার্থে সার, সেচসহ কৃষিখাতে ভর্তুকিবাবদ ৯ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ দিয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কৃষিখাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেন। যার সুদ ৪ শতাংশ হলেও কৃষিখাতে ৯ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকিসহ অন্যান্য প্রণোদনা বিবেচনায় নিলে এটি অত্যন্ত ভালো। এ প্রণোদনার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করে কৃষির সব খাতে (মৎস্য ও প্রাণি খাতসহ) সহায়তা দেয়া সম্ভব হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হামিদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, করোনার এই সময়ে কৃষি উৎপাদনের প্রধান সৈনিক কৃষক ভাইদের পাশে সর্বোচ্চ এবং সর্বপ্রকার সহায়তা দিয়ে রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে। সবার আগে করোনা থেকে তাদের রক্ষা করতে হবে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে কৃষক ভাইয়েরা করোনা প্রতিরোধব্যবস্থায় যেন সামিল থাকেন, সেজন্য সরকারের স্বাস্থ্যবিভাগ ও তথ্যবিভাগের পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী ও কৃষক নেতৃবৃন্দকে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ইতোমধ্যেই করোনা পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্ব খাদ্য পরিস্থিতির হালহাকিকত সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে। সে দিকে লক্ষ্য রেখে কৃষি উৎপাদনে নতুন নতুন পদক্ষেপ নিতে হবে।

আপনার মন্তব্য