করোনা নিয়ে ৫০ দিন আম বাগানে নারী!

27

স্টাফ রিপোর্টার: প্রচণ্ড শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে গাজিপুর থেকে গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে ফিরছিলেন তাহেরা বেগম (৩৫)। পেশায় পোষাককর্মী তাহেরা বাড়ি পৌঁছার আগেই খবর পান, তার শরীরে বাসা বেঁধেছে প্রাণঘাতি করোনা।

এই খবরে যেনো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে তার। কি ভাবে কাটিয়ে উঠবেন এই সংক্রমণ? কিভাবেই বা চলবে সংসার? এমন হাজারো প্রশ্ন জড়িয়ে ধরে আষ্টেপৃষ্টে।

তাহেরা গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের কালিনগর জামাইপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তার স্বামীর নাম মাহবুব আলী। তবে আরেক স্ত্রী নিয়ে আলাদা থাকেন স্বামী। 

রোজিনা বেগম (৫০), ছেলে তারেক রহমান (১৪) ও মেয়ে সুমনা খাতুনকে (১২) নিয়ে আলাদা থাকেন তাহেরা। সংসারের চাকা সচল রাখতে তাহেরা ঢাকায় পাড়ি দেন। ২০০৮ সালের শুরু থেকে কাজ করছিলেন গাজিপুরের একটি পোষাক তৈরীর কারখানায় ফিনিশিং আয়রনম্যান হিসেবে। করোনায় হারাতে বসেছেন সেই চাকরি।

করোনা নিয়ে গ্রামে ফিরে বাড়ির পাশের আমবাগানে একাই আশ্রয় নেন। পরদিন থেকে আম বাগানে অস্থায়ি টিনের ছাপড়া ঘরে ঠাঁয় হয় তার। এর পর সেখানেই একে একে কেটে গেছে ৫০ দিন। করোনার সাথে একলা লড়াইয়ে টিকে রয়েছেন অদম্য এই নারী।

তাহেরা বেগমের ভাষ্য, প্রথম দিকে তার গলা ভারি হয়ে আসছিলো। তারপর শুরু হলো গলা ব্যাথা। কিন্তু শ্বাসকষ্ট ছিলোনা। ধীরে ধীরে তিনি শারীরিকভাবে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েন। অফিস কর্তাদের পরামর্শে ৩০ মে কর্মস্থলেই করোনা পরীক্ষায় নমুনা দেন। 

তিনি ধরেই নিয়েছিলেন তার টনসিল সমস্যা। সমস্যা বাড়তে থাকায় অপারেশনেরও সিদ্ধান্ত নেন। আর খরচ যোগাতে বাড়িতে থাকা গরুটিও বিক্রি করে দেন। এরপর লকডাউন কিছুটা শিথিল হলে সুযোগ বুঝে ৫ জুন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু পথেই অফিস থেকে জানানো হয়-তার করোনা সংক্রমণ ধরা পড়েছে। পরিবারের সুরক্ষায় বাড়ি ফিরে আলাদা থাকারও পরামর্শ দেয়া হয় তাকে।

তিনি জানান, অসুস্থ শরীরে যখন বাড়ি ফেরেন তখন গভীর রাত। পরিবোরের কথা ভেবে ওই রাতে বাড়ির পাশের আম আগানে আশ্রয় নিয়েছিলেন । তার মাথার উপর দিয়ে ওই রাতে বয়ে যায় প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি। সামান্য পলিথিনে কোনরকমে নিজেকে আবৃত করে রাখেন তিনি।

সকালে ওই আম বাগানেই শ্রমিক লাগিয়ে টিনের বেড়া ও ছাউনি দিয়ে ছাপড়া ঘর বানিয়ে দেন মা। তাকে কোনরকমে একটা চৌকি পাতা গেছে।

ওই ঘরেই লকডাউনের নামে টানা একমাস একেবারেই  অবরুদ্ধ কাটাতে হয়েছে। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে আর থাকতে পারেননি। পেটে টান পড়ায় বেরিয়ে এসেছেন। কিন্তু এখনো রাত কাটাতে হচ্ছে সেখানেই।

তাহেরা আরো বলেন, তার করোনা শনাক্তের খবর পেয়ে ওই দিন সকালে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বর ও সচিব এসেছিলেন। তাদের সাথে চৌকিদারও ছিলো। উপজেলা প্রশাসনের বরাত দিয়ে তারা জানিয়ে যান-তিনি যেনো এই ঘর থেকে বের না হন। ওই দিনই তাকে ৫ কেজি চাল, দুই কেজি আলু এবং এক লিটার তেল দেয়া হয়। তা শেষে হয়ে যায় দুই দিনেই। এরপর আর কোন সহায়তা পাননি। পরিস্থিতি দেখে তার সহায়তায় এগিয়ে আসেন গ্রামবাসী। চাল-ডাল সংগ্রহ করেই তারাই পৌঁছে দিয়ে যান। 

শুরুতে চৌকিদারকে দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ৫ দিনের ওষুধ পৌঁছে দেন। সেই ওষুধ শেষ হবার পর আর ওষুধও পাননি। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও পাননি চিকিৎসা সেবা।

১৪ দিন পর দ্বিতীয় দফা নমুনা পরীক্ষার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তাহেরা বেগম। তিনি বলেন, তাকে জানানো হয়েছিলো ১৪ দিন পর তার নমুনা নেয়া হবে। চৌকিদার, মেম্বার চেয়ারম্যান, উপজেলা এমনকি ডিসিকেও ফোন দিয়েছেন। আজ-কাল করতে করতে হয়ে গেলো দুই মাস। এখনো পরীক্ষা করাতে পারেননি। ফলে চাকরিতেও ফিরতে পারেননি। যে চাকরি তার একমাত্র সংম্বল সেই চাকরি এখন যায়যায়।

তাহেরা আরো জানান, শুরু থেকেই ইউনিয়ন পরিষদ সচিব তার খোঁজখবর রাখছিলেন। তাকেও বারবার নমুনা পরীক্ষার অনুরোধ করেছেন, তিনি গুরুত্ব দেন নি। তার প্রশ্ন-এই পরিস্থিতিতে চাকরি হারালে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেবেন কিভাবে?

নিরুপায় হয়ে তিন দিন আগে তিনি রহনপুরে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়েছিলেন। সেদিনও তার নমুনা পরীক্ষা হয়নি। একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছিলো। পরে তারা যোগাযোগ করে তথ্য নিয়েছে। শনিবার (২৬ জুলাই) তাকে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বর্ষায় আমবাগানের একটি অংশ জলমগ্ন। তাহেরা বেগমের ছাপড়া ঘড়টি দাঁড়িয়ে রয়েছে যেনো বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপে। সন্ধার কিছুটা আগে কাদাপানি মাড়িয়ে বাড়ি ফেরেন তাহেরা। বাড়ির দরজার নামনেই পাওয়া গেলো তাকে।

তিনি জানালেন, সন্তানদের জন্য খাবার রান্না করতেই তিন বেলা বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের কড়াকড়িতে এখনো রাত কাটাচ্ছেন ওই অস্থায়ি ঘরেই। 

রাস্তাঘেঁসা খাস জমিতে টিনের ঘরতুলে বাস করে আসছেন তাহেরা বেগম। এটুকই তার সম্বল। করোনায় চাকরি হারানোর উপক্রম হলেও এখনো বেঁচে আছেন এটাই শান্ত্বনা। 

তাহেরা বেগমের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা অমানবিক বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তারা বলছেন, কি ইউনিয়ন পরিষদ, কি উপজেলা প্রশাসন-তারা করোনা পেলে কেবল বাড়ি লকডাউন করে যায়। মাইকিং করে এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরী করে। কিন্তু বাড়ির ভেতরে আক্রান্ত পরিবার মরলো  না-কি বাঁচলো সেখবর নেয়ার লোক নেই। 

এই বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে বোয়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শুকুরুদ্দিনকে পাওয়া যায়নি। ফোন রিসিভ করে ছেলে আবদুস সালাম জানান, তার বাবা কয়েকদিন ধরে অসুস্থতায় ভুগছেন। তিনি কথা বলারমত অবস্থায় নেই।

যোগাযোগ করা হলে সব অভিযোগ অস্বীকার করেন ইউনিয়ন পরিষদ সচিব রবিউল ইসলাম। তার দাবি, শুরু থেকেই তিনি তাহেরা বেগমের খোঁজখবর রাখছিলেন। নমুনা নেয়ার জন্য তিনিও বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু নমুনা দিতে পারেননি।

জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। এমনটি হয়ে থাকলে ইউনিয়ন পরিষদ সেটি বলতে পারবে।

এবিষয়ে জেলার সিভিল সার্জন ডা. জাহিদ নজরুল চৌধুরী বলেন, উপসর্গ না থাকলে ১৪ বা ২১ দিন পর সংক্রমিতদের সুস্থ বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু ওই নারীর এতোদিন লকডাউনে থাকার প্রশ্নই ওঠেনা। কেনো এমন হলো বিষয়টি খোঁজ নিয়ে জানতে হবে।

এমন ঘটনা কিভাবে ঘটলো তা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক এ জেড এম নূরুল হক। ওই নারীর দ্রুত নমুনা পরীক্ষাসহ এই নিয়ে কারো অবহেলা পেলে ব্যবস্থা নেয়ারও আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।

আপনার মন্তব্য