31.4 C
Rajshahi
বৃহস্পতিবার, মে ১৯, ২০২২

করোনা সংক্রমণ ঝুঁকিতে রামেক হাসপাতাল

স্টাফ রিপোর্টার: করোনা সংক্রমণ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল। জেলার একমাত্র করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হওয়ায় প্রতিদিন এখানে আসছেন করোনা রোগী। কিন্তু নেই পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা। রোগীর স্বজনরাও যাওয়া আসা করছেন অন্যান্য রোগী এবং তাদের স্বজনদের সঙ্গে। মাইকিং করেই দায় সারছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফলে হাসপাতাল থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রামেক হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে ৮৮ সাধারণ বেডের বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ৮৬ জন। খালি নেই আইসিইউ। প্রতিদিনই আইসিইউর জন্য লাইন বাড়ছে রোগীদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নেই। উন্নত চিকিৎসায় রোগীদের নেওয়া হচ্ছে রাজশাহীতে।

করোনা রোগী বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালের তিনতলার ২৫ নম্বর ওয়ার্ডটি করোনা ওয়ার্ড হিসেবে চালু করা হয়েছে। এতো দিন হাসপাতালের চক্ষু ওয়ার্ড হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে আসছিল এটি। সেখানে নেই পর্যাপ্ত বেড ও অক্সিজেন সুবিধা।

এই ওয়ার্ডে রোগীদের আনা নেওয়ার জন্য নেই লিফট সুবিধা। সিঁড়ি বেয়ে ওয়ার্ডে যেতে হচ্ছে করোনা রোগীদের। আবার এই সিঁড়ি ব্যবহার করছেন হাসপাতালের অন্যান্য রোগী ও তাদের স্বজনরা।

করোনা ওয়ার্ডে প্রয়োজনে চিকিৎসক-নার্স পাচ্ছেন না রোগীরা। ভরসা কেবল সঙ্গে থাকা স্বজনরা। পরে অন্যান্যদের সঙ্গে মিশে এই স্বজনরাই যাওয়া আসা করছেন হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডের সামনে দিয়ে। এতে হাসপাতালজুড়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে, হাসপাতাল সংলগ্ন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ বুথে নেওয়া হচ্ছে করোনার নমুনা। সুস্থ মানুষের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে নমুনা দিচ্ছেন অসুস্থরাও। লাইনে দাঁড়াতে স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা করছেন না অনেকেই।

নমুনা দিতে আসা কিংবা করোনা চিকিৎসায় আসা রোগীর স্বজনরা হাসপাতাল চত্বরেও অন্যদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন। যাওয়া আসা করছেন রিকশা কিংবা অটোরিকশায়। এদের আবার কেউ কেউ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনের ফুটপাতের খাবারের দোকানে বসে খাবার খাচ্ছেন।

তাছাড়া বর্হিবিভাগের টিকিট কাউন্টারে লম্বা লাইন। চিকিৎসকদের কক্ষের বাইরেও এই ভিড়। জরুরি বিভাগের অবস্থাও প্রায় একই। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড, নিউরোমেডিসিন ওয়ার্ড, গাইনি ওয়ার্ডসহ আরো কয়েকটি ওয়ার্ডে রোগী ও স্বজনদের ঠেলাঠেলি। ওয়ার্ডে বেড না পেয়ে বারান্দায় অনেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।

রামেক হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, দিনে অন্তত ৪০০ জন রোগী ভর্তি হন হাসপতালে। তাদের সঙ্গে স্বজন আসেন আরও ৫ শতাধিক। হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন আরও কয়েকশ মানুষ। সব মিলিয়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার লোকের আনাগোনা হয় এখানে।

সরেজমিনে হাসপাতাল চত্বর ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালে আসা লোকজনদের অধিকাংশই এসেছেন এই অঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে। তারা কর্তৃপক্ষের টাঙানো কোনো নির্দেশনার ধার ধারছেন না। নিরাপত্তা কর্মীদের মাইকিংয়ে কান দিচ্ছেন না অনেকেই।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রধান ফটকে প্রবেশ এবং বর্হিগমনে আলাদা পথ তৈরি করা হয়েছে। সেটি বাদ দিয়ে লোকজন ইচ্ছেমতো যাওয়া আসা করছেন। হাসপাতাল চত্বরে বসার জায়গাগুলোতে গাদাগাদি করে বসছেন লোকজন। এদের অনেকেই মুখে মাস্ক পরলেও তা যথাযথভাবে পরছেন না। হাসপাতালের বাইরের ফুটপাতে বসা দোকানপাটে অনেকেই যাচ্ছেন।

কেবল নিজেদেরই নই, অসচেতন লোকজন ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স এবং চিকিৎসা কর্মীদের। গত ২৭ মার্চ রাতে করোনায় মারা যান রামেক হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক আবদুল হান্নান। হাসপাতালে রোগী দেখতে গিয়ে সংক্রমিত হন তিনি।

করোনায় গত বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা গেছেন রামেকের বায়োকেমেস্ট্রি বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. এম ওবাইদুল্লাহ। টানা চার দিন রামেক আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন তিনি। করোনা নিয়ে গত বুধবার হাসপাতালে এসেছেন আরও দুজন চিকিৎসক।

গত বৃহস্পতিবার করোনা শনাক্ত হয়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৬ জন চিকিৎসকের। শুক্রবার আরও দুই চিকিৎসকের করোনা ধরা পড়ে। এর বাইরো আরও অন্তত ৩০ জন চিকিৎসক-নার্সের করোনা ধরা পড়েছে। হাসপাতাল থেকেই এরা সংক্রমিত হয়েছেন বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই পরিস্থিতিতে সংক্রমণ ঝুঁকির শঙ্কায় খোদ রামেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস। তিনি জানান, তারা রোগী ও তাদের স্বজনদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাসপাতালে প্রবেশের নির্দেশনা দিচ্ছেন। সবার সুরক্ষায় হাসপাতালে আগমন ও বর্হিগমন পথ আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন নির্দেশনা টাঙানো হয়েছে। মাইকিং করে লোকজনকে সচেতন করছেন হাসপাতালের কর্মীরা। কিন্তু কিছুতেই লোকজনকে এই নির্দেশা মানানো যাচ্ছে না।

হাসপাতালের বাইরের ফুটপাতে দোকানপাট সংক্রমণ শঙ্কা আরও বাড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন হাসপাতালের উপপরিচালক। তিনি বলেন, আমরা এসব দোকানপাট উচ্ছেদে গত ৩ এপ্রিল নগরীর রাজপাড়া থানা পুলিশকে চিঠি পাঠিয়েছেন। তারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

জানতে চাইলে চিঠি পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন নগরীর রাজপাড়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজাহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষের চিঠি পেয়ে হাসপাতালের সীমানা প্রাচীর সংলগ্ন ফুটপাত দখলমুক্ত হয়েছে। তবে সমস্যা সড়কের উল্টো দিকে অনেকটা স্থায়ী রূপ নিয়েছে।

সেখানে অস্থায়ী হোটেলসহ বেশ কিছু দোকানপাট বসেছে। গত তিন মাসের মধ্যে ছয়বার এই দোকানপাট উচ্ছেদ করেছে পুলিশ। কিন্তু উচ্ছেদের পর পরই আবারও ফিরে এসেছেন লোকজন। এ নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। 

এদিকে, শুক্রবার রাতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিসিআর ল্যাবে ৩৭৬ জনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এর মধ্যে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১০৪ জনের। রাজশাহী জেলার ২৯৬ জনের নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ৯১ জনের। এ ছাড়া জয়পুরহাটের ৮০ নমুনা পরীক্ষা করোনা ধরা পড়েছে ১৩ জনের। জয়পুরহাটের দুটি নমুনার ফলাফল আসেনি। 

এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত রাজশাহী বিভাগে ২০২ জনের করোনা শনাক্ত হয়। এদের মধ্যে ৬৫ জনই রাজশাহী জেলার বাসিন্দা। বিভাগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৮৯০ জনের করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে রাজশাহীতে। এই জেলায় সুস্থ হয়েছেন ৬ হাজার ৯৯ জন। তবে করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৯ জন।

বিভাগের ৮ জেলায় এই পর্যন্ত করোনা শনাক্ত হয়েছে ২৮ হাজার ৫৯ জনের। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ২৫ হাজার ৫৭ জন। করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪২১ জন। 

অসচেতনতায় প্রতিদিনই বিভাগজুড়ে করোনা সংক্রমণ লাফিয়ে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতরের পরিচালক ডা. হাবিবুল আহসান তালুকদার। সংক্রমণ ঠেকাতে জনসমাগম এগিয়ে চলার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

Related Articles

আপনার মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your name here
Please enter your comment!

Stay Connected

0Fansমত
3,312অনুগামিবৃন্দঅনুসরণ করা
0গ্রাহকদেরসাবস্ক্রাইব
- Advertisement -spot_img

Latest Articles