কারাগারে কাটানো ৮৫ দিন ‘বিশ্রাম’ দাবি মালির

18

স্টাফ রিপোর্টার: হত্যা মামলায় টানা ৮৫ দিন রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে কাটিছেন রাজশাহী সরকারী পিএন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মালি সুজন আল হাসান। কিন্তু এই ৮৫ দিন তিনি বিশ্রামে ছিলেন বলে দাবি করেছেন। এনিয়ে চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্রও জমা দিয়েছেন সরকারী পিএন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে।

জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ২০১৯ সালের ৭ জুলাই নগরীর ভুগরইল পশ্চিমপাড়া এলাকার নিজ বাড়িতে প্রতিবেশীদের নৃশংস হামলার শিকার হন আবদুল হান্নান ও তার ছেলে সেলিম রেজা। এর তিন দিন পর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সেলিম।


এই ঘটনায় ওই দিনই ২১ জনকে আসামী করে শাহমখদুম থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের বাবা আবদুল হান্নান। মামলায় ৩ নম্বর এজাহারনামীয় আসামী সুজন আল হাসান। মামলার অন্য আসামীরা তার ভাই, নিকটআত্মীয় ও সহযোগী।

গত বছরের ২২ অক্টোবর মামলায় অন্য আসামীদের সাথে আদালতে হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন সুজন। পরে আদালতে তাদের জেলহাজতে পাঠিয়ে দেন। দীর্ঘ ৮৫দিন কারাগারে কাটিয়ে এই বছরের ১৬ জানুয়ারী ছাড়া পান সুজন।


অভিযুক্ত সুজন রাজশাহী নগরীর শাহমখদুম থানার ভুগরইল পশ্চিমপাড়া এলাকার নওশাদ আলীর ছেলে। ২০১০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে মালি হিসেবে সরকারী পিএন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে কর্মরত তিনি।


কারাগারে কাটানো দিনগুলো ছুটি দেখিয়ে পার পেয়েছেন সুজন। জামিনে থাকায় এখন নিয়মিত অফিস করেছেন। তবে এনিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হলে তোলপাড় শুরু হয়। পরে দলবল নিয়ে মামলার বাদির বাড়িতে হামলা চালান সুজন।


সরকারী পিএন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা তৌহিদ আরার ভাষ্য, তিনি বিষয়টি টেরই পাননি। তাকে কারাবন্দি থাকার বিষয়টি জানাননি সুজন। জানতে পেরে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন। সেটির জবাবও দিয়েছেন।


এদিকে, গত ৫ অক্টোবর সুজন আল হাসান প্রধান শিক্ষকের নোটিশের জবাব দিয়েছেন। সাথে জুড়েছেন রাজশাহী মডেল হাসপাতালের কনসালটিং ফিজিশিয়ান ডা: এবিএম কামরুল আই সরকারের প্রত্যয়নপত্র।


তিনি দাবি করেছেন, মেরুদন্ড ও মাজা ব্যাথাজনিত কারণে তিনি রাজশাহীর ওই বেসরকারী হাসপাতালটিতে গিয়েছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শে টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট অনুযায়ী তাকে চিকিৎসক দুই মাস বিশ্রামের পরামর্শ দেন।


তবে সুজন আল হাসানের এমন সুস্থ্যতার বিষয়টি জানাতে পারেননি তার সহকর্মীরা। নাম প্রকাশ না করে পিএন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারী জানান, আগে কখনোই তার মরুদন্ড ও মাজা ব্যাথাজনিত সমস্যার কথা শোনা যায়নি। কিন্তু তিনি কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে এই সমস্যার কথা প্রচার করছেন।


এদিকে, সুজন আল হাসানকে ভুয়া প্রত্যয়নপত্র দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন ফিজিশিয়ান ডা: এবিএম কামরুল আই সরকার। তিনি জানিয়েছেন, তার কাছে সুজন আল হাসানের স্ত্রী এসেছিলেন। ওই সময় সুজন যে কারাগারে ছিলেন তা তিনি জানাননি। জানিয়েছিলেন, তার স্বামীর শারীরিক অবস্থা খারাপ।

পরে তাকে একটি চিকিৎসা ফরম সরবরাহ করা হয়। তিনি সেটা পুরণ করে দেন। পরে সেই ফরম অনুযায়ী ব্যবস্থাপত্রসহ দুই মাস বিশ্রামের পরামর্শ দেয়া হয়। যাচাই না করে কারাবন্দিকে তিনি প্রত্যয়ন দিয়ে ভুল করেছেন বলে স্বীকার করেন এই চিকিৎসক।


রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. গিয়াস উদ্দীন বলেন, তার (সুজন আল হাসান) কারাগারে আগমন হয় ২০ অক্টোবর, ২০১৯। তিনি কারামুক্তি পান ১৫ জানুয়ারি, ২০২০ সালে। এসময়ের মধ্যে তিনি পুরোপুরি সুস্থ্য ছিলেন। জেল হাসপাতালে কখনই ছিলেন না। বেসরকারী হাসপাতালে নয়, অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসায় হয় কারাবিধি মেনে সরকারী হাসপাতালে।


জেল সুপার আরো বলেন, কারাগারে সাক্ষাতে আসা ব্যক্তিদের এক টুকরো কাগজ এপার ওপার করার ক্ষমতা নেই। সেখানে বাইরের মেডিকেল ফরম, অফিসিয়াল নোটিশ, ছুটির দরখাস্ত বা কোনো কাগজপত্র সই করে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। যে কোনো প্রকারের কাগজাদি সংক্রান্ত কাজ থাকলে উকিলের মারফত প্রেরণ করতে হবে, অন্যথায় সম্ভব নয়।


ভুয়া চিকিৎসা সনদ ও ব্যবস্থাপত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে মালি সুজন আল হাসান বলেন, ‘তিনি অসুস্থ ছিলেন। তবে কোন হাসপাতালে, কখন চিকিৎসা নিয়েছেন তা মনে নেই। কাগজপত্র দেখে জানাতে হবে।


সূত্র বলছে, সুজনকে মামলা থেকে বাঁচাতে শুরু থেকেই মরিয়া প্রধান শিক্ষিকা তৌহিদ আরা। তাকে ভুয়া প্রত্যয়নও দিয়েছেন প্রধান শিক্ষক। হত্যাকাণ্ডের দিন (২০০৯ সালের ৭ জুলাই) ও পরদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সুজন বিদ্যালয়ে দায়িত্বপালন করেছেন বলে এতে দাবি করেন প্রধান শিক্ষক তৌহিদ আরা।


ডা: এবিএম কামরুল আই সরকার প্রধান শিক্ষিকা তৌহিদ আরার ঘনিষ্ট। ওই চিকিৎসকের মেয়ে ওই বিদ্যালয়ের তৃতীয় শেণির শিক্ষার্থী। প্রধান শিক্ষিকা ভুয়া চিকিৎসা সনদ দিতে ওই চিকিৎসককে প্রভাবিত করেছেন। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে।


তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে প্রধান শিক্ষিকা তৌহিদ আরা। তিনি বলেন, তাকে (সুজন) কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। তিনি জবাব দিয়েছেন। সমস্ত কাগজ ঢাকায় পাঠানো হয়েছে, অপরাধী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার মেডিকেল সনদ ভুয়া কি-না এনিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি প্রধান শিক্ষিক।

আপনার মন্তব্য