চাকরি ছেড়ে দল গুছিয়েছেন নওশের আলী

380
চাকরি ছেড়ে দল গুছিয়েছেন নওশের আলী

স্টাফ রিপোর্টার: পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার পর সাঁড়াশি অভিযান চলেছে দেশজুড়েই। বেছে বেছে সামনের সারির মুজিব সৈনিকদের ধরে নিয়ে গিয়ে পাশবিক নির্যাতন এমনকি হত্যা করে ঘাতকের দল।

ওই সময় নওগাঁর রাণীনগর থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা নওশের আলী। তার বাবা মৃত ছাবের আলী প্রমাণিক ছিলেন থানা আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

ওই সময় তরুণ তুর্কি নওশের আলীর সন্ধানে বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু বিপদ আঁচ করতে পেরে আগেই বাড়ি ছাড়েন রণাঙ্গণের এই যোদ্ধা। এরপর প্রথমে ঢাকায় এবং পরে চট্টগ্রামে গিয়ে অবস্থান নেন। চেষ্টা করেন দলকে সংগঠিত করার।

যাযাবর অবস্থায় থেকেই উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন সড়ক ও জনপথ বিভাগে। নিশ্চিত উন্নত জীবনের হাতাছানি তাকে সরাতে পারেনি রাজনীতির পথ থেকে। তাছাড়া চাকরিতে ছিলো পদে পদে সততা হারানোর শঙ্কা। আর এ সব কারণেই মাত্র তিন বছরের মাথায় লোভনীয় সেই চাকরি ছেড়ে পুরোদুস্তর রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

এরপর এলাকার মানুষের সেবা হয়ে যায় তার একমাত্র ব্রত। কি রাত কি দিন, খবর পেলে ছুটে যান মানুষের কাছে। আপনজন হিসেবে এলাকার মানুষও তাকে কাছে টেন নেন পরম মমতায়।

মুক্তিযোদ্ধা নওশের আলীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বেশ দীর্ঘ। ছাত্র অবস্থায় ১৯৬৫ সালে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে নাম লেখান। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালে রাণীনগর থানা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হন। মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশমাতৃকার টানে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে যান।

রণাঙ্গনের এই লড়াকু সৈনিক ৭ নং সেক্টরের ৩ নং সাব-সেক্টর (মহদিপুর সাব-সেক্টর) কমান্ডার বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সহযোদ্ধা ছিলেন। মর্টার প্লাটুন কমান্ডার, এমএফসি এবং আর্টিলারি ওপি হিসেবে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন নওশের আলী। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ি সংগ্রামে আসে বিজয়। যুদ্ধ শেষে তিনি আবারো ফিরে আসেন নিজ গ্রামে।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ১৯৭২ সালে তিনি রানীনগর থানা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্বপান। ১৯৭৩ সালে রাণীনগর থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন নওশের আলী। ১৯৭৪ সালে থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হন।

এলাকার রাজনীতির পাশাপাশি রাজশাহী নগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা নওশের আলী। তিনি ১৯৯১ সালে রাজশাহী নগর আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৭ সাল হতে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিন মেয়াদে নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপালন করেন। ২০১৫ সাল হতে এ পর্যন্ত নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির দায়িকত্বপালন করছেন।

একেবারেই সাদাসিদে জীবনযাপন করেন মুক্তিযোদ্ধা নওশের আলী। তার নাড়ি পোঁতা রাণীনগরের গোনা খাজুরিয়াপাড়ায়। আবাস গড়েছেন রাজশাহী নগরীর কাদিরেগঞ্জ এলাকায়। রাজনীতির পাশাপাশি যুক্ত হন প্রেস ব্যবসায়। তবু নাড়ির টানে সবসময় ফিরে যান নিজ গ্রামে। গ্রামের মানুষের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখেন নিরন্তর।

এরই ধারাবাহিকতায় মুক্তিযোদ্ধা নওশের আলী ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নওগাঁ-৬, (রাণীনগর-আত্রাই) আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন প্রার্থী। বরাবরই দলীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে নৌকার প্রার্থীকে জেতাকে সক্রিয় থেকেছেন মাঠে। আসন্ন উপনির্বাচনেও দলের মনোনয়ন চেয়েছেন এই পোড়খাওয়া রাজনৈতিক। দলের মনোনয়ন পেলে নৌকার বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবেন এমনটিই প্রত্যাশা মুক্তিযোদ্ধা নওশের আলীর।

মুক্তিযোদ্ধা নওশের আলীর সহধর্মীনি রাশেদা বেগমও যুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। নগর মহিলা লীগের সহসভাপতির দায়িত্বপালন করেন তিনি। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে দলীয় পদ থেকে সরে আসেন। কিন্তু স্বামীর সাথে সহযোগী হিসেবে রয়ে গেছেন এখনো। এই দম্পতির চার কন্যা সন্তান। সকলেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।

বীর যোদ্ধা নওশের আলী মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণেও কাজ করেছেন বহুদিন। দায়িত্বপালন করেন রাজশাহী জেলা মুক্তিযোদ্ধা বহুমখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবেও। সল্পসময়ের চাকরিতেও নিজের স্বকীয় অবস্থান তৈরী করেন। নেতৃত্বের দক্ষতা থেকে পেশাজীবীদের অধিকার আদায়েও অগ্রণী ভুমিকা বাখেন। ফলে চাকরি ছেড়ে দেয়ার পরও তাকে ছাড়েননি পেশাজীবীরা। ১৯৮২ সাল থেকে পর পর দুই মেয়াদে আইডিইবির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন নওশের আলী। বর্তমানে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

রাজশাহীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বেশ পরিচত মুখ মুক্তিযোদ্ধা নওশের আলী। বাংলাদেশ বেতার রাজশাহী কেন্দ্রের তালিকাভূক্ত প্রথম শ্রেণির নাট্যশিল্পী তিনি। অভিনয় করেছেন মঞ্চ এবং টেলিভিশনেও। শ্রোতা দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন অভিনয় গুণে। তার পরিবার একটি সাংস্কৃতিক ‘ইনস্টিটিউশন’। বাংলাদেশ বেতার নাট্যকার নাট্যশিল্পী সংসদ রাজশাহী অঞ্চলের দুই মেয়াদের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির দায়ত্বিপালন করেন তিনি।

১৯৮২ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পরপর ৬ মেয়াদের তিনি রাজশাহী জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পদকেরও দায়িত্বপালন করেন। রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম শিক্ষা-সাংস্কৃতিক- সামাজিক প্রতিষ্ঠান রাজশাহী এসোসিয়েশনের কোষাধক্ষ্য পদে রয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা নওশের আলী।

লেখালেখিতেও সমান পারদর্শী মুক্তিযোদ্ধা নওশের আলী। রণাঙ্গণের দিনলিপি প্রাঞ্জলভাবে তুলে এসেছেন ‘বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের আর্টিলারি বাহিনী ও আমার মুক্তিযুদ্ধ’ বইয়ের পাতায়। যা এখনকার প্রজন্মকে নিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের সেইসব দিনগুলোতে। এর বাইরেও তার রচিত রাজনীতি এবং উন্নয়ন বিষয়ক কলাম ও প্রবন্ধ প্রকাশ হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

আপনার মন্তব্য