36.7 C
Rajshahi
বৃহস্পতিবার, মে ১৯, ২০২২

ছুটি মানেই করোনা পজিটিভি, নইলে না

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীতে বেড়েছে করোনার প্রকোপ। বাড়ছে সংক্রমণ, প্রতিদিনই মৃতের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নাম। করোনা যুদ্ধের সম্মুখ সারির যোদ্ধারাদের তার বিরাম নেই একবিন্দুও। চাইলেও জরুরী প্রয়োজনে ছুটি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) কর্মরত আউটসোর্সিং কর্মীরা।

নাওয়া-খাওয়া ভুলে রাতদিন এক করে নমুনা সংগ্রহের কাজ করছেন এসব কর্মী। করোনার সাথে বাস করেও ইসোলেশনে থাকা কিংবা খাবারের বন্দবস্ত নেই তাদের। বেতন নেই দীর্ঘ ৫ মাস। চাপা কষ্ট থাকলেও ‘না’ করেননা এসব কর্মী। 

স্বাস্থ্য দফতরের আউটসোর্সিং কর্মী হুমায়ন কবীর। অ্যাটেনডেন্টে পদে তিনি নিযুক্ত রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। দায়িত্বপালন করেন করোনার নমুনা সংগ্রহকারী হিসেবে এখানকার আরটিপিসিআর ল্যাবে।

তিনি বলেন, করোনা যুদ্ধে নেমেও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশন ব্যবস্থা নেই। দিনশেষে পরিবারের কাছে ফিরে যাচ্ছেন। ঝুঁকির মুখে পড়ছে পুরো পরিবার। আইসোলেশনে থাকার ব্যবস্থা থাকলে এই শঙ্কা থাকতোনা।

তিনি যোগ করেন, লোকবল কম। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের সাপ্তাহিক ছুটি নেই। পরিবারের সাথে আলাদা সময় কাটানোর জন্য ছুটি বলতে বড় উৎসব। বিশেষ করে দুই ঈদ। যেহেতু ঈদের দিনও ল্যাব চলে সেকারণে কর্মীদের ভাগ করে একটা দল ছুটি পায়।

আরেকটা দল পরের ঈদের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। পরিস্থিতির বাস্তবতায় ছুটি মেলে তখনই, যখন তারা আক্রান্ত হন করোনায়। তাদের কাছে টানা ছুটি মানে করোনা পজিটিভ, নইলে না।

হুমায়ন কবীরের মতো অন্তত ৯ জন আউটসোর্সিং কর্মী রাজশাহী মেডিকেলে টেকনোলজিস্ট ও ল্যাব অ্যাটেনডেন্টে পদে নিযুক্ত। এদেরই একজন আব্দুল্লাহ আল নোমান। ঝিনাইদহ থেকে এসে অস্থায়ি নিবাস গড়েছেন রাজশাহীতে। 

করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া মরদেহের নমুনা নিতে অন্য সহকর্মীরা আপত্তি তোলেন, নোমান তখনই ভরসা। যেখানে- যে অবস্থায় থাকুন না কেনো তাকে ফোন দিয়ে ডেকে নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। 

ফোন পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে যান নোমান। তার ভাষ্য, তিনি যত বিলম্ব করবেন, ততটা সময় মরদেহ পড়ে থাকবে। প্রিয়জন হারানো স্বজনদের অপেক্ষাও ততটা বাড়বে। 

করোনার ভয় ডরহীন এই কর্মী জানান, এটি এমন একটি পেশা যার কারণে পাতের ভাত থেকে হাত তুলে বেরিয়ে যাবার ঘটনা তার বহুবার ঘটেছে। এখন আপনি বলতে পারেন আর কেউ কি ছিল না? হ্যাঁ ছিল। কিন্তু আমাদের টিমে মৃতদেহ থেকে কেউই নমুনা নিতে রাজী হয় না।

নমুনা সংগ্রহে গিয়ে তিনবার তার শরীতে বাসা বেধেছিলো প্রাণঘাতি করোনা। কিন্তু বার বারই হার মেনেছে। নোমান বলেন, তার কাজের ধরণটা হলো সরাসরি কোভিড রোগীদের সংস্পর্শে গিয়ে। এখানে তাদের জীবনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সংক্রমণ যতটাই বাড়ুক, ঝুঁকি যতই থাক, নমুনা সংগ্রহের কাজটা করতেই হবে। ভয় পেলে চলবে না।  

একই ভাষ্য আরেক আউটসোর্সিং কর্মী সোহেল রানা রুবেলেরও। তিনি বলেন, প্রতিদিনই তারা রাজশাহী মেডিকেলে কলেজ পয়েন্ট ও নগরীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেন। কিন্তু যাতায়াত খরচটুকুও দেয়া হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ব্যয় করতে হয় নিজেদের পকেট থেকে।

আবার কাজ করেন আরটিপিসিআর ল্যাবেও। অথচ তাদের সময়মতো মেলে না বেতন। এদের বেশিরভাগ একাধিকবার করোনা আক্রান্ত হলেও তাদের জন্য বরাদ্দ নেই চিকিৎসা বা ঝুঁকি ভাতা। অস্থায়ী কর্মী হওয়ায় বৈষম্যের শিকার তারা।

এদিকে, ঝুঁকি জেনেও রাজশাহীতে করোনার নমুনা সংগ্রহে নাম লিখিয়েছেন  অন্তত: ৩০ জন স্বেচ্ছাসেবী। তারা কোনো ধরণের নিয়োগ ছাড়াই কাজ করছেন দিনের পর দিন। তবে সরকারী ও বেসরকারী অনুদান থেকে তাদের সামান্য কিছু সম্মানি দেয়ার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে এনিয়ে আক্ষেপ নেই স্বেচ্ছাসেবী নমুনা সংগ্রাহক রুবিনা পারভীনের। তিনি জানান, করোনা সংক্রমণের শুরুতে নমুনা সংগ্রহের জন্য যখন কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন  নিজেরাই মনস্থির করেন তারা মানবিক বিবেচনায় কাজটি করবেন। যেহেতু তার পড়াশোনা প্যারামেডিকেলে, চিন্তাটি কার্যকর করতে সময় লাগেনি। 

গতবছর প্রশিক্ষণ নিয়ে সিটি করপোরেশনের হয়ে নমুনা সংগ্রহ শুরু করেন তারা। বিগত কিছুদিন থেকে সিটি করপোরেশন তাদের মাসে ১২ হাজার টাকা করে ভাতা দেয়া শুরু করেছে।

রাজশাহীতে প্রকোপ বাড়ায় বর্তমানে ১৩টি পয়েন্টে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট করেছে রাসিক। রাসিক স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরাও নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কাজটি করছেন।

তারা জানান, নিয়মিত সম্মানির বাইরে এর জন্য আলাদা করে কোন ভাতা দেয়া হয় না। যেহেতু স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মী, সেকারণে এই মহামারিকালে মানবিক বিবেচনা বোধ থেকে সরাসরি কোভিড রোগীদের সংস্পর্শে গিয়ে কাজ করছেন।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের রাজশাহী জেলা সভাপতি ডা. চিন্ময় কান্তি দাস বলেন, মহামারির এই সময়ে নমুনা সংগ্রকারীদের সুযোগ সুবিধা বাড়ানো উচিত স্বাস্থ্য বিভাগের। এবং সেটি জরুরিভাবেই করা প্রয়োজন।

কয়েক দফা চেষ্টা করেও এনিয়ে মোবাইল সংযোগ পাওয়া যায়নি বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতরের পরিচালক ডা. হাবিবুল আহসান তালুকদারের। ফলে এনিয়ে তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দফতরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. রোজী আরা খাতুন জানিয়েছেন, তিনি সম্প্রতি এখানে যোগদান করেছেন। বিষয়টি তার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার কথাও জানান তিনি।

Related Articles

আপনার মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your name here
Please enter your comment!

Stay Connected

0Fansমত
3,312অনুগামিবৃন্দঅনুসরণ করা
0গ্রাহকদেরসাবস্ক্রাইব
- Advertisement -spot_img

Latest Articles