পোড়া মোটেলে প্রাণ ফিরলো ৭ বছর পর 

19

চাঁপাইনবাবগঞ্জ: নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিলো মাত্রই। চালুর কয়েকদিন আগেই নাশকতার আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ পর্যটন মোটেল। দীর্ঘ সাত বছর পর সংস্কার করা হয়েছে এটি। পোড়া ক্ষত সারিয়ে প্রাণ ফিরেছে জেলার একমাত্র এই পর্যটন মোটেলটি।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মোটেলটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের কথা থাকলেও সেটি পিছিয়ে গেছে। তবে থেমে নেই মোটেলের কর্মকান্ড। এরই মধ্যে অতিথিদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে মোটেলটি।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৩ মার্চ উদ্বোধন হবার কথা ছিলো সোনামসজিদ পর্যটন মোটেল। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারী মোটেলে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।

ওই দিন নিহত হন পর্যটন বিভাগের একজন নির্বাহী প্রকৌশলীও। আগুন ও ভাঙচুরে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মোটেলটি আর চালু করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও মোটেল এর তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পারিসা কনস্ট্রাকশন প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে মোটেলটি নির্মাণ করে। নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে ২০১২ সালের ৩০ ডিসেম্বর পারিসা কনস্ট্রাকশন এটি পর্যটন করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু তার আগেই দুর্বৃত্তরা মোটেলে আগুন দিয়ে ভবনসহ আসবাব ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সোনামসজিদে ভারতে যাতায়াতের ইমিগ্রেশন ও স্থলবন্দর রয়েছে। এছাড়া ছোট সেনামসজিদসহ বেশকিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা থাকায় এখানে প্রতিদিনই পর্যটক আসেন। পর্যটকদের অত্যাধুনিক সুবিধা দিতেই সরকার এখানে পর্যটন মোটেল নির্মাণ করে। কিন্তু ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় জামায়াত-শিবির কর্মীরা হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে মোটেলটি। এরপর দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত পড়ে থাকে এটি।

ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটন মোটেলটি সংস্কার করে চালু করার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম। এর পরেও পর্যটন মোটেলটি চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। এর প্রায় ৫ বছর পর এটি সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে বেসামরিক ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

জানা যায়, মুসলিম স্থাপত্য শিল্পে সমৃদ্ধ বাংলার পুরাতন রাজধানী গৌড়ে বিপুল সম্ভবনা থাকা সত্তেও সোনামসজিদে পর্যটনের ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমান সরকার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর শিবগঞ্জ উপজেলার পিরোজপুর মৌজায় পর্যটন মোটেল নির্মাণের জন্য পর্যটন করপোরেশনের নামে এক একর জমি অধিগ্রহণ করে। ২০১০-১১ অর্থবছরে সোনামসজিদে পর্যটন শিল্প বিকাশের জন্য এটির জন্য অর্থ বরাদ্দ দেন।

এদিকে, এ গৌড়ে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ও মেজর নাজমুল হকের সমাধি, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের গণকবর, ঐতিহাসিক তাহখানা, কামেল পীর হজরত শাহ নেয়ামতুল্লাহ (র.)-এর মাজার, ছোট সোনামসজিদ, শাহ সুজার প্রাসাদ, দারসবাড়ির মসজিদ, মাদরাসা, কোতোয়াল দীঘি, টাকশাল দীঘি, দখলদরজা, চামাকাঠি মসজিদ, ধনাইচক মসজিদ, খঞ্জনদীঘির মসজিদসহ অসংখ্য পীর আউলিয়াদের মাজার। বিশাল এক দীঘি যার নাম বালিয়াদীঘি।

এখানে সুপ্রাচীন স্থাপত্যগুলো দেখার জন্য দেশি-বিদেশি পর্যটকরা আসেন। প্রতিদিন এ এলাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখার জন্য দেশি-বিদেশি বহু পর্যটক এখানে আসেন।

এছাড়াও সোনামসজিদে রয়েছে দেশের অন্যতম দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর, কাস্টমস ইমিগ্রেশন অফিস। এখান দিয়ে প্রতিদিন পাসপোর্টের মাধ্যমে ভারত যাতায়াত করে থাকেন দু’দেশের নাগরিকরা।

জেলা সদর থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে সোনামসজিদ ঘুরতে আসা প্রভাষক রফিকুল ইসলাম বলেন, এর আগেও এখানে ঘুরতে এসেছি। তবে ভালোমানের কোন খাবারের দোকান না থাকায় বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসতে হতো। তবে পর্যটন মোটেলের কার্যক্রম শুরু হয়েছে শুনে আবারো ঘুরতে এসেছি। এবার বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসিনি, মোটেলে খেলাম ও খাবার মানও ভালো।

ঢাকা থেকে ব্যবসায়ীক কাছে এসেছিলেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, আগে ব্যবসায়ীক কাজে অনেকবার আসতে হয়েছে সোনামসজিদে কিন্তু এখানে রাত যাপনের কোন ব্যবস্থা থাকায় জেলা সদরে গিয়ে থাকতে হতো। এখানে সব থেকে বড় সমস্যা ছিলো রাতে থাকার। কিন্তু এবার মোটেলে থেকেছি।

তিনি আরও বলেন, দেশের দ্বিতীয় স্থলবন্দর সোনামসজিদে হওয়ায় বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা এসে থাকা ও খাবারের সমস্যায় পড়তেন। কিন্তু এখন মোটেল চালু হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিনের সে সমস্যার সমাধান হয়েছে।

মোটেলের নির্বাহী অফিসার মনোয়ার ফেরদৌস খন্দকার জানান, গত মাসের ২৭ তারিখ প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক উদ্ধোধনের কথা থাকলেও তাঁর সিডিউল জনিত কারনে তা সম্ভব হয়নি। তবে আনুষ্ঠানিক উদ্ধোধন না হলেও সকল কার্যক্রম শুরু চলছে মোটেলের।

তিনি জানান, পর্যটকদের জন্য উন্নতমানের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে এবং স্থানীয় অন্যন্য খাবারের হোটেলের চেয়ে খাবারের মান এখানে স্বাস্থ্যসম্মত। এছাড়াও খাবারের মূল্য স্থানীয় হোটেলগুলোর সমপর্যায়ে।

তিনি আরও জানান, তিন তলাবিশিষ্ট পর্যটন মোটেলটিতে রয়েছে ১৮টি ভিআইপি কক্ষ, সাধারণ কক্ষ ১২টি, ইকোনমি কক্ষ ও সাধারণের জন্য ডরমিটরি কক্ষ ১২টি, অভ্যর্থনা কক্ষ একটি, ক্যান্টিন একটি, রান্নাঘর একটি, একটি বৈদুতিক সাবস্টেশনের ব্যবস্থা রয়েছে।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম বলেন, ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি সংস্কার করা হয়েছে। এটি আধুনিকায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি এটি দৃষ্টি নন্দন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আগুনে আমাদের প্রায় সবকিছুই নষ্ট হয়ে গেছিলো। এগুলোকে আবারও নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আমাদের সকল ফার্নিচার ও অনুসঙ্গিক জিনিসও কেনা হয়েছে।

সদ্য বিদায়ী চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক এ জেড এম নূরুল হক জানান, গত মাসের শেষের দিকেই আনুষ্ঠানিকভাবে মোটেলটির কার্যক্রম শুরু হবার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এ পর্যটন মোটেলের এর মধ্যদিয়ে জেলার পর্যটন শিল্প আরও বিকশিত হবে।

আপনার মন্তব্য