বিভীষিকায় বছর পার বগুড়াবাসীর

3
দেশে করোনায় মৃত্যু ছাড়াল সাড়ে ৭ হাজার

বগুড়া: ২০২০ সালকে বিদায় জানিয়ে এসেছে নতুন বছর ২০২১। কিন্তু বিদায়ী বছরটি বগুড়াবাসীর জন্য ছিল দুঃস্বপ্নের। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বগুড়ার দু’জন সংসদ সদস্য, তিন জন সাংবাদিক এবং আটজন চিকিৎসক। এছাড়া হত্যা, গুম ও নারী নির্যাতনসহ চাল কেলেঙ্কারির একাধিক ঘটনাও আলোচিত হয় বছরজুড়ে।

গতবছর ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এরপর এই মহামারি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পর বগুড়া ছিল সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের শহর। উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার মধ্যেও বগুড়ার সিরিয়াল সবচেয়ে এগিয়ে। ২৪ মার্চ বগুড়ায় প্রথম করোনা রোগীর মৃত্যু হয়।

চিকিৎসকদের মধ্যে ৪ জুন ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে করোনাভাইরাসে মৃত্যু হয় রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক হাবিবুর রহমানের (৯২)। ১৪ জুলাই করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যান শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের প্রসূতি ও গাইনি বিভাগের সাবেক সহকারী অধ্যাপক শামস শায়লা বানু। ৮ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সিরাজগঞ্জ শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের অর্থপেডিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেজওয়ানুল বারী শামীম (৪৯)। ২ সেপ্টেম্বর বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রংপুর মেডিকেল কলেজের সাবেক প্রভাষক বিএম ফারুক (৬৭)।

৮ সেপ্টেম্বর করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর পুরান ঢাকার আসগর আলী হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় মারা যান ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথের সাবেক পরিচালক এবং বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক উপপরিচালক নির্মলেন্দু চৌধুরী (৬১)। ২৫ অক্টোবর রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে মারা যান বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগ ও করোনা ইউনিটের প্রধান অধ্যাপক এ কে এম মাসুদুর রহমান (৬০)।

২৬ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চিকিৎসক গাজী শফিকুল আলম চৌধুরী (৭৭)। তদের সবাই বগুড়া জেলার।

৬ আগস্ট করোনায় মারা যান স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (অলটারনেট মেডিসিন) মো. আবদুল লতিফ (৫৮)।

২ এপ্রিল হাওয়া হয়ে যায় বিদেশ ফেরত এক হাজার ২৯০ জন। করোনাকালে তাদেরকে আইসোলেশনে থাকার নির্দেশনা দেয়া হলেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। নিজের বাড়ি ছেড়ে তারা আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে গিয়ে গা ঢাকা দেন।

২০ এপ্রিল বগুড়ায় প্রথম করোনা পরীক্ষার জন্য পিসিআর ল্যাব স্থাপন হয়। এখান থেকে শুরুতে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার রোগীরা পরীক্ষা করাতেন। ২১ এপ্রিল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সমগ্র বগুড়া জেলা লকডাউন ঘোষণা করে প্রশাসন। ২৪ এপ্রিল বগুড়ায় চিকিৎসাধীন প্রথম করোনা রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।

৮ মে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বগুড়া কারাগার থেকে আগাম মুক্তি দেয়া হয় ৮৮ জন বন্দিকে। ২০ মে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান বগুড়ার সাবেক নারী সংসদ সদস্য কামরুন্নাহার পুতুল। ২০ জুন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান বগুড়া প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী পরিচালক মজিবুর রহমান।

অন্যদিকে ১ জানুয়ারি একই দিন শহীদ মিনারে জুতাপায়ে ওঠা নিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। লাঞ্ছিত হন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী। হামলার ঘটনায় ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবকদলের প্রায় ৭০০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গণমামলা দায়ের করা হয়।

২৯ মে শুক্রবার ছুটির দিনে গোপনে খাদ্যগুদাম থেকে চাল বিক্রি করে ট্রাকযোগে পাচার করার সময় হাতেনাতে গ্রেফতার হন গাবতলী উপজেলা খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম। একই সঙ্গে ১৫ টন চালসহ ট্রাক ও ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেনকেও গ্রেফতার করা হয়।

৫ জুন জুমার দিন মসজিদের সামনে খুন হন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু হানিফ মিস্টার। পূর্ব শত্রুতার জের ধরে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

১৬ আগস্ট ধরা পড়ে প্রতারক ডিজে শাকিল। তাকে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ থেকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ তার কাছে প্রতারণার বিভিন্ন নিয়োগপত্র, ব্যাংক ঋণ দেয়ার কাগজসহ এক হাজার ২০০ কোটি টাকার চেক উদ্ধার করে।

২৯ সেপ্টেম্বর ধুনটের নিমগাছি ইউনিয়নে ১০০ মণ খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিক্রির সময় হাতেনাতে গ্রেফতার হন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নবাব আলী ও আব্দুল হামিদ। তারেদকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

২১ অক্টোবর শিবগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তাফিজার রহমানের হাত ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয়। খুনীরা এখনও অধরা।

২৫ অক্টোবর শহরে শাশুড়ির শতকোটি টাকা আত্মসাৎ মামলায় আদালত থেকে কারাগারে যান আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ার হোসেন রানা এবং তার স্ত্রী সরিফা সুলতানা।

২৬ অক্টোবর দুর্গাপূজা চলাকালে সাবগ্রামে মন্দির চত্বরে খুন হন সুব্রত দাস নামে আরেক সন্ত্রাসী।

২৮ অক্টোবর বগুড়া জেলা প্রশাসকের প্রতিকী দায়িত্ব পালন করেন ন্যাশনাল চিলরেন্ড টাস্কফোর্সেও সভাপতি পুস্পা খাতুন।

৫ নভেম্বর মারা যান বগুড়া জিলা স্কুলের প্রবীণ শিক্ষক ও নাট্যকার শ্যামল ভট্টাচার্য। ১০ জুলাই মারা যান বগুড়ার গবেষক ও শিক্ষাবীদ আব্দুল মান্নান।

বছরের শুরুতে ঘুষ কেলেঙ্কারির মধ্যে পড়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন বগুড়া কর অফিস। দুদকের অভিযানে ১ জানুয়ারি ৫০ হাজার ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার হন বগুড়া কর কমিশনার অভিজিৎ কুমার দে।

২ জানুয়ারি এক কোটি টাকার অনিয়মে দুদকের মামলায় হাজিরা দিতে গিয়ে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান বগুড়ার গাবতলী পৌরসভার মেয়র সাইফুল ইসলাম, সচিব শাহীন মাহমুদ, সহকারী প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম, উপ সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মজিদসহ কাউন্সিলর সামসুল আলম।

অপরদিকে আশা জাগানিয়ার বছরও ছিল ২০২০ সাল। বগুড়া থেকেই প্রথম করোনা আক্রান্তদের বাঁচাতে প্লাজমা দেয়ার উদ্যোগ নেয় পুলিশ প্রশাসন। একইসঙ্গে দেশের জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তিনটি গাড়িও প্রথম বগুড়া জেলাকেই দেয়া হয়। ১৬ আগস্ট বগুড়ার করোনা জয়ী ৫৯ জন পুলিশ সদস্য ঢাকায় গিয়ে প্লাজমা দান করেন।

একই বছর জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডে প্রথম স্থান অর্জন করে বগুড়া জেলা। এখানে ৪ হাজার ১০৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়।

১১ ফেব্রুয়ারি বগুড়ায় অনুষ্ঠিত হয় ব্যতিক্রমী সাইকেল র্যালি। স্কুলের ক্ষুদে দেড় হাজার শিক্ষার্থী একযোগে ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সাইকেল র্যালি বের করে। এর উদ্দেশ্য ছিল মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া।

আপনার মন্তব্য