ব্যবস্থা নিতে না পারায় ১০ লাখ অপরিকল্পিত গর্ভধারণ

18
ব্যবস্থা নিতে না পারায় ১০ লাখ অপরিকল্পিত গর্ভধারণ

নারী ডেস্ক: করোনাভাইরাসের মহামারির প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন নারীরা। মহামারির কারণে মেয়েদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ তীব্রতর হয়েছে।

একদিনে যেমন পারিবারিক সহিংসতা বাড়ছে, অন্যদিকে লাখ লাখ নারী পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ, কিংবা গর্ভপাতের সুযোগ না পাওয়ায় অপরিকল্পিত গর্ভধারণে বাধ্য হয়েছেন।

কয়েক মাস ধরে মহামারি চলার কারণে অনেক নারীই সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা নিতে না পারায় এরকম অপরিকল্পিত গর্ভধারণ করেছেন।

মেরি স্টোপস ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৭ টি দেশে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে প্রায় ২০ লাখ নারী কম সেবা পেয়েছেন। এর মধ্যে শুধুমাত্র ভারতেই ১০ লাখের বেশি নারী সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

সংস্থাটি ধারণা করছে, এর ফলে গোটা বিশ্বে এ বছর ৯ লাখ অপরিকল্পিত গর্ভধারণের ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, এর ফলে অনিরাপদ গর্ভপাত ও মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকিও বেড়েছে।

মেরি স্টোপরেসর পরিচালক ক্যাটরিন চার্চ বলেন, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার অন্য কোথাও পরিষেবাগুলি যদি এই সময়ে হ্রাস পেয়ে থাকে তবে এই সংখ্যা আরও বাড়বে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, মে ও মধ্য জুলাইয়ের প্রথমদিকে ১০৩ টি দেশের ওপর জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, ওই সব দেশের দুই-তৃতীয়াংশ পরিবারে পরিবার পরিকল্পনা এবং গর্ভনিরোধক পরিষেবাগুলি ব্যাহত হয়েছে।

মার্কিন জনসংখ্যা তহবিল বিশ্বব্যাপী এই সময়ে ৭০ লাখ অপরিকল্পিত গর্ভাবস্থা হতে পারে বলে আগেই সতর্ক করেছে।

জরিপে দেখা গেছে, লকডাউন, ভ্রমণে বিধিনিষেধ, সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি, কোভিড-১৯ সংক্রমণের ভয়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ায় অনেক নারী ও অল্প বয়সী মেয়ে ঠিক মতো পরিচর্যা পাননি।

আফ্রিকান দেশ কেনিয়ার ওইমেন প্রোমেটার সেন্টারের ডায়ানা কিহিমা জানান, রাজধানী নাইবোরির কিবেরা বস্তিতে লকডাউনের মধ্যে অল্প বয়সী অনেক মেয়ে অপরিকল্পিত গর্ভধারণের পর গর্ভপাত ঘটানোর জন্য কাঁচের টুকরা, কাঠি এবং কলম ব্যবহার করেছে।

এতে দুইটি মেয়ে গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। আবার কারও কারও শরীর এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সে আর কখনও মা হতে পারবে না।

ইন্টারন্যাশনাল প্যারেন্টহুড ফেডারেশন জানিয়েছে, পশ্চিম আফ্রিকার কিছু অংশে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় লকডাউনে গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণের পরিমাণ শতকরা ৫০ ভাগ কমেছে।

আফ্রিকান ১৬ টি দেশে নারী ও অল্প বয়সী মেয়েদের পরিচর্যার কাজে সমন্বয়কারী মামা নেটওয়ার্কের ডায়ানা মোরেকা জানান, এমন অবস্থা কখনও দেখেনটি। তাদের সংস্থাটি চালু হবার পর থেকে প্রথমবারের মতো জানুয়ারি মাস থেকে লকডাউন চলাকালীন সময়ে কঙ্গো, জাম্বিয়া এবং ক্যামেরুন থেকে তাদের হটলাইনে দৈনিক ২০ হাজারেরও বেশি নারী তাদের সমস্যা নিয়ে কল করেছেন।

তিনি বলেন, পরিবার পরকল্পনা ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে করোনা মহামারি আমাদের অনেক পেছনে নিয়ে গেছে।

কিছু দেশ লকডাউনের সময় যৌন এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা অপরিহার্য হিসাবে বিবেচনা করেনি। রোমানিয়ার বেসরকারি সংস্থাগুলি সরকারকে ওই সময় এই পরিষেবাগুলো প্রয়োজনীয় ঘোষণার চাপ দেয়। আইপিপিএফ ইউরোপীয় নেটওয়ার্কের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ড্যানিয়েলা ড্রাগিচি জানান, এরপরও অনেক হাসপাতালে এখনও গর্ভপাতের সুবিধা রাখা হয়নি।

তিনি জানান, এর ফলে অনেক নারী অরিকল্পিত গর্ভপাত ঘটানোর জন্য কমিউনিটির কারও কাছে ছুটেছেন। এতে তাদের স্বাঁস্থ্যঝুকি বেড়েছে।

ভারতের এক চিকিৎসক ডা. শেভেতাঙ্গী শিনেদ জানান, মার্চ মাসে লকডাউন শুরু হওয়ার পরে ভারতের মুম্বাইয়ের নারী গর্ভাবস্থা পরীক্ষার জন্য কিট খুঁজে পাননি। পরে তিনি গর্ভপাতের করানোর জন্য যখন হাসপাতালে আসেন তখন সেটা করানোর উপায় ছিল না। এরকম আরো অনেক ঘটনাই ঘটেছে।

ইন্ডিয়ান ইয়থ অ্যাডভোকেট সংস্কার একজন শিনডে জানান, লকডাউনের সময় ভারতে গর্ভপাতকে প্রয়োজনীয় পরিষেবার অন্তুর্ভুক্ত করলেও অনেকেই সেটা জানতেন না। এতো অপরিকল্পিত গর্ভধারণ ও অনিরাপদ গর্ভপাত বেড়ে গেছে।

ফাউন্ডেশন ফর রিপ্রোডাকটিভ হেলথ সার্ভিসেস ইন্ডিয়ার এক জরিপে দেখা গেছে, ভারতে গর্ভপাত ব্যবস্থার উন্নতি হলেও লকডাউনে বেশ কয়েকটি রাজ্যে গর্ভপাতের বড়ির ঘাটতি সৃষ্টি তৈরি হয়েছিল।

এর মধ্যে হরিয়ানা ও পাঞ্জাবের মতো উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলির মধ্যে কেবল শতকরা ১ ভাগ ফার্মেসি, দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুতে শতকরা ২ভাগ, মধ্য প্রদেশের রাজ্যে ৬ দশমিক ৫ ভাগ ও দিল্লিতে শতকরা ৩৪ ভাগ ফার্মেসিতে ওষুধগুলি পাওয়া গেছিল। এছাড়া কিছু গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা সরবরাহজনিত শৃঙ্খলার অভাবে বিঘ্নিত হয়েছিল।

উইম্যান গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ফর রিপ্রোডাকডিভ রাইটস আফ্রিকার সমন্বয়কারী ননডো ইজানো জানান, তানজানিয়ার দারাস সালামে বেশিরভাগ মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে কোভিড-১৯ চিকিৎসা কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে। তার প্রশ্ন ওই পরিস্থিতিতে নারীরা কোথায় সেবা নিতে যেতেন?

তিনি জানান, গত সপ্তাহে তিনি দেশটির কিগোমা শহরের একটি স্কুল পরিদর্শন করেছেন। গত কয়েক মাসে সেখানকার পাঁচ জন ছাত্রী গর্ভধারণ করেছে। তিনি বলেন, এক স্কুলের পাঁচ জন ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা ।সুতরাং গর্ভধারণের হার নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে।

মামা নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী ফোনেসিনা আরঞ্চান বলেছেন, ঠিক এখনই গোটা পরিস্থিতি নিয়ে আমরা বলতে পারবো না। লকডাউন পুরোপুরি উঠে গেলে সব বিষয় পরিষ্কার হবে। তার ভাষায়, সবাইকে সেই সময়ের জন্য নিজেদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

আপনার মন্তব্য