ভ্যাকসিন থেকে বহু দূরে বাংলাদেশ

8
ভ্যাকসিন থেকে বহু দূরে বাংলাদেশ

জাতীয় ডেস্ক: বাংলাদেশে কোভিড-১৯’র ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য চীনের সিনোভ্যাক বায়োটেক লিমিটেড সরকারের অর্থায়ন (কো-ফান্ডিং) চাইলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাতে রাজি না হওয়ায় ভ্যাকসিন পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকার জোর দিয়ে বলছে, ভ্যাকসিন তৈরির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা প্রথম সারির পাঁচটি সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। তবে, বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভ্যাকসিন পেতে অন্যান্য দেশগুলো যে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তার তুলনায় বাংলাদেশের প্রচেষ্টা তেমনটা দৃশ্যমান না।

তারা আরও বলছেন, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা পরিচালনা করছে, এমন সংস্থাগুলোর ভ্যাকসিন পেতে বেশ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে বিনিয়োগ করলেও বাংলাদেশ সরকার এখনো এই ধরনের কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

এদিকে, সময়ও ফুরিয়ে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে এ বছরের শেষ বা পরবর্তী বছরের শুরুতে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিবন্ধনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

মানবদেহে প্রথম করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের পরীক্ষা গত মার্চ মাস থেকে শুরু হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত পাঁচটি সম্ভাব্য ভ্যাকসিন সীমিত ব্যবহারের জন্য অনুমোদনও পেয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমস করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন ট্র্যাকারের তথ্য অনুযায়ী, ওই পাঁচটির বাইরে কমপক্ষে আরও ১১টি সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের ট্রায়াল বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে।

মঙ্গলবার রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের সিনোভাক বায়োটেক লিমিটেডের তৈরি ভ্যাকসিনের দেশীয় ট্রায়ালে বাংলাদেশ কো-ফান্ড করবে না বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

বেইজিং-ভিত্তিক সিনোভ্যাক গত মাসে তুরস্কে ‘করোনাভ্যাক’ নামের সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল শুরু করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভ্যাকের তৃতীয় পর্যায়ে ট্রায়ালে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য সরকারের কাছে এখন আর দুটি বিকল্প রাস্তা আছে।

একটি হলো, ‘কোভ্যাক্স’ সুবিধার অধীনে ডব্লিউএইচও এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের (গ্যাভি) কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিনের ২০ শতাংশ বাংলাদেশ পেতে পারে। বিশ্বব্যাপী সবার জন্য ভ্যাকসিন নিশ্চিতকরণে ‘কোভ্যাক্স’ ডব্লিউএইচও ও গ্যাভির নেতৃত্বে একটি গৃহীত উদ্যোগ।

দ্বিতীয় বিকল্প হলো, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি বা অন্যান্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী ব্যাপক চাহিদা ও সারিতে থাকা দেশগুলোর কারণে ‘কোভ্যাক্স’ সুবিধার অধীনে ভ্যাকসিন পাওয়া বেশ জটিল হবে।

‘কোভ্যাক্স’ বর্তমানে নয়টি সম্ভাব্য ভ্যাকসিনকে যুক্ত করেছে। ২০২১ সালের শেষ পর্যন্ত সাইন আপ করা প্রায় ১৭০টি দেশে দুই বিলিয়ন ভ্যাকসিনের শটের নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এটি কাজ করছে।

এদিকে, সংস্থা বা অন্যান্য দেশের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য সরকারের কোনো দৃশ্যমান প্রচেষ্টা নেই। তবে, একটি তহবিলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকার মার্কিন সংস্থা মডার্না, ফাইজার, যুক্তরাজ্যের অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ভারতের ভারত বায়োটেক লিমিটেড এবং রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

মডার্নার একটি সম্ভাব্য ভ্যাকসিন থাকলেও কোম্পানিটি এখনও কোনো পণ্য বাজারে আনেনি।

সংস্থা ও দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।

মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজিএইচএস) অধ্যাপক এ বি এম খুরশিদ আলম বলেন, ‘আমাদের পর্যাপ্ত তহবিল রয়েছে। আমরা যদি প্রয়োজন দেখি তবে আমরা গ্যাভি থেকে সরবরাহ করা ভ্যাকসিনের বাইরেও কিনব… আমরা (অন্যান্য উত্স থেকে) ভ্যাকসিন কিনব।’

তিনি জানান, ভ্যাকসিনের জন্য একটি প্রকল্পের আওতায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ আছে এবং সরকার নিজস্ব রাজস্ব থেকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করেছে। এ ছাড়াও, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকেও তহবিল চাওয়া হয়েছে।

অধ্যাপক খুরশিদ বলেন, ‘আমরা অপেক্ষা করছি … অগ্রিম অর্থ প্রদান কাকে দেওয়া হবে সে সম্পর্কে মন্ত্রণালয় থেকে আমাদেরকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।’

ডিজিএইচএসের এক কর্মকর্তা জানান, ভ্যাকসিনের বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দেখছেন। এ কারণে ডিজিএইচএসের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কিছু জানেন না।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (এনটিএসি) সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার তহবিল বরাদ্দ করেছে, এটা ভালো। তবে, ভ্যাকসিন পাওয়ার ক্ষেত্রে এটা অগ্রগতি কি না, আমরা তা জানি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার স্পষ্টভাবে কিছু বলছে না। তারা বলছেন যে, যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে, আমরা কী পরিমাণে ভ্যাকসিন পেতে পারি এটা কি প্রকাশ করা হয়েছে?’

সরকারের তহবিল নিয়ে অলস বসে থাকা উচিত হবে না বলে জানান তিনি।

বিএসএমএমইউর ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের উপযুক্ত ভ্যাকসিন নির্বাচন করতে হবে। আমাদের এমন কোনো ভ্যাকসিন নেওয়া উচিত হবে না, যা সংরক্ষণ ও বহন করার জন্য বিস্তৃত ব্যবস্থা প্রয়োজন।’

সরকারের আরও সতর্ক হওয়া উচিত এবং একটি টেকসই ও সাশ্রয়ী মূল্যের ভ্যাকসিন তৈরি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

একাধিক সম্ভাব্য ভ্যাকসিন উৎপাদনকারীর সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়া ও সমস্ত চ্যানেল উন্মুক্ত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দেশে বুধবার পর্যন্ত করোনায় মারা গেছেন পাঁচ হাজার ৫৯৩ জন। এ নিয়ে করোনায় মৃত্যুর হার দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৪৬ শতাংশে। পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা তিন লাখ ৮২ হাজার ৯৫৯ জন। বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি করোনা আক্রান্ত শনাক্তের তালিকায় বাংলাদেশ বর্তমানে ১৬তম অবস্থানে আছে।

আপনার মন্তব্য