রাজশাহীর পাম অয়েলে আশা দেখছে বাংলাদেশ

22
রাজশাহীর পাম অয়েলে আশা দেখছে বাংলাদেশ

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশে অপার সম্ভাবনার দুয়োর খুলে দিতে পারে বাণিজ্যিক পাম চাষ। রাজশাহীতে পরীক্ষামূলক পাম চাষে মিলেছে সাফল্যের হাতছানি। রাস্তা কিংবা রেলাইনের ধারে, পতিত ও অনাবাদি জমি পাম চাষের আওতায় আনার সুপারিশ করেছেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) গবেষকরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় বড় প্রকল্প নেয়া জরুরী। যাতে যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ ল্যাব স্থাপন, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পাম চাষ, তেল উৎপাদন ও বাজারজাত করা যায়। এতে ভোজ্য তেলের আমদানি নির্ভরতা কমবে। রপ্তানী করেও আয় করা সম্ভব প্রচুর বৈদেশিক মুদ্র। সম্ভাবনাময় পাম পাল্টে দিতে পারে দেশের অর্থনীতির গতিধারা।

জানা গেছে, গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে রাজশাহীতে বিসিএসআইআর গবেষণা কেন্দ্রে পাম চাষ শুরু করে। দেশে পাম গাছের প্রজনন, বৃদ্ধি ও উৎপাদন এবং ফলের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানতেই এই গবেষণা প্রকল্প। তিন বছরের মধ্যেই ফল এসেছে এখান তিন একর জমিতে রোপন করা তিনশ’ পাম গাছে। গবেষকরা বলছেন, পুরোদমে উৎপাদনে আসতে আরো বছরদুয়েক সময় লাগবে।

তবে এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে প্রকল্পের মেয়াদ। গত মাসে প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক বিসিএসআইআর এর অয়েল, ফ্যাট এন্ড ওয়েক্সেস রিসার্চ ডিভিশনের প্রিন্সিপাল সান্টিফিক অফিসার মো. মইনউদ্দিন প্রকল্পের চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। তাতে রাজশাহী অঞ্চলে পাম চাষ নিয়ে তুলে ধরা হয়েছে অপার সম্ভাবনার কথা।

মইনউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু পাম গাছের জন্য খুবই উপযোগী। সঠিকভাবে পামের চাষাবাদ, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে দেশে ভোজ্য তেলের স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন সক্ষম। সেই সাথে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও পাম তেল রপ্তানি করে তেল উৎপাদনশীল দেশের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান সম্ভব বলে দাবি গবেষক মইন উদ্দিনের।

বিসিএসআইআর বলছে, এশিয়া ও আফ্রিকান দেশগুলোতে পাম গাছ প্রচুর পরিমাণে থাকায় তারা দীর্ঘদিন যাবৎ এই পাম ওয়েল সিড থেকে তেল নি:সরণ করে সেটি ভোজ্য তেল হিসেবে ব্যবহার করছে। এতে ফ্যাটি এসিড ও কোলেস্টরেল থাকলেও তাতে ক্ষতি হচ্ছে না।

তাছাড়া পামে আছে ভিটামিন ‘ই’। যা ক্যান্সার প্রতিরোধে খুবই শক্তিশালী ও কার্যকর। আবার পুষ্টিমানের দিক থেকে গাজরের তুলনায় পামে রয়েছে ১৫ গুণ এবং টমেটোর তুলনায় ৩০০ গুণ বিটা-ক্যারোটিন। যা মানব দেহে ভিটামিন ‘এ’ উৎপাদনে সহায়তা করে। সঙ্গত কারণেই পাশ্চাত্যে এখন পাম তেলের ব্যবহার বেড়েছে বহুগুনে।

এছাড়া পামের বীজ থেকেও তেল উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু এই বীজ থেকে সামান্যই তেল পাওয়া যায়। ফলে বীজ ব্যবহার হয় সাবান ও প্রসাধনী তৈরির কোম্পানিগুলো। কাজেই পামের প্রতিটি উপাদানেই রয়েছে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ।

মইনউদ্দিন আরো বলেন, বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলের মাটি, আদ্রতা, তাপমাত্রা ও গড় বৃষ্টিপাত পাম গাছের বৃদ্ধির জন্য খুবই উপযোগী। এছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চল, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ বিভাগীয় অঞ্চলগুলির অনাবাদি জমিতেও পাম চাষে যেমন সম্ভাবনা রয়েছে। এখানকার পাম ফল মালেশিয়ায় উৎপাদিন পাম ফলের চেয়ে আকারে বড়। উৎপাদনও প্রায় দি¦গুন। আবার পাম গাছে বছরে ৩ বার ফল নামানো যায়।

তিনি বলেন, প্রথমে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল সেনা ক্যাম্প থেকে পাম গাছের চারা ও ফল সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে তিনি সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাম গাছ ও তার ফল সংগ্রহে নেমে পড়েন। রাজশাহীর বেলপুকুর এলাকায় মহাসড়কের পাশে লাগানো পাম গাছ থেকে পাম সংগ্রহ করে প্রথম গবেষণায় ভালো ফলাফল পান। পরবর্তীতে নওগাঁর ফজলুল হক নামের এক কলেজ শিক্ষকের কাছে থেকে ৩০০টি চারা এনে গবেষণাগারের পতিত জমিতে বাগান তৈরী করেন। তিন বছর বয়সি পাম গাছে ফল এসেছে। পুরোদমে উৎপাদনে আসতে আরো অন্তত: দুই বছর সময় লাগবে।

প্রথমে ফল থেকে তেল সংগ্রহের বিষয়টি বেশ কঠিন ছিল জানিয়ে মইনউদ্দিন বলেন, পাম ফলের বীজ ও উপরের মাংসল অংশ থেকে ভোজ্য তেল পাওয়া যায়। মালেশিয়ান ও আফ্রিকান স্থানীয়রা ব্লিচিং পদ্ধতিতে পাম ফল থেকে তেল বের করেন। গুগল ও ইউটিউবে বিভিন্ন তথ্যের মাধ্যমে ল্যাবেও প্রাথমিকভাবে ব্লিচিং পদ্ধতিতে তেল বের করেন তারা। এখন ইঞ্জিনিয়ারিং মেশিন পদ্ধতিতে তেল উৎপাদনের অপেক্ষা। এই ধাপে তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়। মেশিনটি তৈরী হলেই সঠিকতা যাচাই করে পুরোপুরি বাণিজ্যিক ধাপে পাম তেল উৎপাদনে যাওয়া যাবে।

বাংলাদেশের পাম তেলের সম্ভাবনার বিষয়ে তিনি জানান, বর্তমানে সরকার ১২-১৫ হাজার কোটি টাকার তেল আমদানি করে। আমদানিকৃত ভোজ্য তেলের ৬০ শতাংশই পাম ওয়েল। এছাড়াও ভোজ্য তেলের দিক থেকে বিশে^ প্রথম পাম তেল। তাছাড়া আবহাওয়া ও জলবায়ুগত দিক দিয়ে বাংলাদেশ ও বিশে^র শীর্ষ পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ মালেশিয়ার খুব একটা পার্থক্য নেই।

মালেশিয়ার চেয়ে বাংলাদেশের জমির উর্বরতা শক্তিও বেশি। এই উপযোগীতা ও সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে অনাবাদী, পতিত জমি এবং রাস্তা কিংবা রেল লাইনের ধার ঘেঁষে পাম চাষ করা যায়। এতে পাম তেলে শুধু সমৃদ্ধই হবে না, বরং বিদেশে তেল রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এটি কেবলই আশাব্যঞ্জক নয় উৎসাহব্যঞ্জকও বটে।

সম্ভবনাময় পাম চাষ গবেষনায় সফলতায় আশাবাদি রাজশাহী বিসিএসআইআর এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. ইব্রাহিম। তিনি বলেন, এই গবেষণা প্রকল্পের ফলাফল খুবই ভালো এসেছে। প্রয়োজনীয় সরকারি পদক্ষেপ ও সহযোগিতা পেলে হয়ত এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশও হতে পারে ভোজ্য তেল উৎপাদনে বিশে^র শীর্ষস্থানীয় দেশ।

তাছাড়া বহু বাংলাদেশ মালেশিয়ায় গিয়ে সেখানকার বাণিজ্যিক পাম বাগানে শ্রম দেন। এদের দেশে ফিরিয়ে এনে তাকে মেধা বাণিজ্যিক পাম চাষে কাজে লাগানো যায়। বাণিজ্যিক পাম চাষ, ভোজ্য তেল উৎপাদন ও বিপণন সম্ভব হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিধারা পাল্টে যাবে।

আপনার মন্তব্য