শামীনূর রহমান: নওগাঁ জেলা শহরের চারপাশে অনেক বাগান। আম, কাঁঠাল, পেয়ারা,লেবু ছাড়াও রয়েছে বিরাট বিরাট রেইন ট্রি। আরো নাম না জানা অনেক গাছ। এই গাছগুলোজুড়ে অসংখ্য পাখির আনাগোনা।

সবে মাত্র ভাঙা পা সেরে উঠছি তাই ডাক্তার এর পরামর্শে নিয়মিত শহর থেকে খানিক দূরে নিরিবিলি স্থানে হাঁটি। যেতে যেতে বিভিন্ন রকম পাখি দেখে সময় কাটাই।

নওগাঁ শহরের যান্ত্রিক কোলাহলের ভেতরে শহরের বাহিরে এই প্রাকৃতিক পরিবেশে আমি খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

একদিন বিকেলে মাঠের সবুজ ঘাসের ওপর বসে আছি হঠাৎ দেখি দূরের কড়াই গাছ থেকে উড়ে এসে আমাদের সামনে পেয়ারা গাছের ডালে বসলো একটি অদ্ভুত সুন্দর পাখি। এদের ওড়ায় বেশ ছন্দ আছে।

ফটফট শব্দে গোটা কয়েক ডানার ঝাপটা, ডানা ও লেজ ছড়িয়ে শূন্যে ভেসে চলা, আবার ডানার ঝাপটা, আবার ভাসা। ওড়ার সময় দেখা যায় ডানার কয়েকটা পালক সাদাটে। লেজের মাঝের পালকও তাই। দুপাশে কালোর মাঝে যেন ফ্রেম আঁটা।

পাখিটির নাম হাঁড়িচাচা। ইংরেজি নাম Tree pie কিংবা Tree crow । বৈজ্ঞানিক নাম Dendrocitta vagabubda। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাকের জ্ঞাতিভাই এই হাঁড়িচাচাকে বেশ কিছু আঞ্চলিক নামে ডাকা হয়। যেমন কুটুম পাখি, লেজ ঝোলা, ঢেঁকিলেজা প্রভৃতি।
 

হাঁড়িচাচা সুন্দর পাখি। স্ত্রী ও পুরুষ দেখতে একই রকম। লম্বায় লেজসহ ১৬ থেকে ১৮ ইঞ্চি। শুধু লেজটাই লম্বায় প্রায় ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি। বাংলাদেশের লেজওয়ালা পাখিদের মধ্যে এই পাখিটি অন্যতম। এতো বড় লেজের কারণে পাখিপ্রেমীদের দৃষ্টি কাড়ে সে। হাঁড়িচাচার শরীরের পালকের রঙ বাদামি পাটকিলে।

মাথা, গলা এবং বুকের কিছু অংশ পাটকিলে আভাযুক্ত ফিকে কালো। হাঁড়িচাচার লেজে মোট ১২টি পালক থাকে। লম্বা লেজের মাঝের পালক দুটি বেশি লম্বা। ছোট ডানা ও লেজের রঙ ধূসর সাদা। বাকিগুলো কালো।

লেজের অগ্রভাগ কালচে। কাকের মতো শক্ত মোটা ও ধারালো চঞ্চু। কালচে স্লেট ধূসর চঞ্চু কিছুটা চাপা ও বাঁকা। পায়ের রঙ গাঢ় স্লেট ধূসর। পেছনের নখযুক্ত পা একটু বড়। চোখের মণি লালচে।

পাখি প্রেমী প্রাণ প্রকৃতির সভাপতি কাজী নাজমুল বলেন,

সম্ভবত মাটির হাঁড়ি একখানি খোলা দিয়া ঘর্ষণ করিলে যে শ্রুতিকটু শব্দ উৎপন্ন হয়, তাহার সহিত ইহাদের স্বরের সাদৃশ্য বশতঃই বোধহয় ইহা এই নাম, বা বদনাম, লাভ করিয়াছে।

গ্রীষ্মকালে আমাদের শহরে এদের আনাগোনা বেশী। তবে শীতকাল আর বর্ষাকালে যে দেখা যায় না এমন নয়।

শহর থেকে পল্লীগাঁয়ের অতি পরিচিত পাখি হাঁড়িচাচা। শরীরে রঙের বাহার আর আকর্ষণীয় লম্বা লেজের কারণে ব্যাপক পরিচিত এই পাখি উঠে এসেছে বাংলা সাহিত্য তথা ছড়া, গল্প, কবিতায়।

তাইতো যুগে যুগে মা তাঁর শিশু সন্তানকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে ছড়া কাটেন : আয়রে পাখি লেজঝোলা/খোকন নিয়ে কর খেলা,/খাবি-দাবি কলকলাবি/খোকাকে মোর ঘুম পাড়াবি।

Leave a Reply