ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা

প্রিয় দেশ ডেস্ক: আওয়ামী লীগের উপকমিটি থেকে বহিষ্কারের পর হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসায় অভিযান দিয়ে শুরু। এরপর সপ্তাহখানেকের মধ্যে একইভাবে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে চিত্রনায়িকা পরীমনি, প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ, মডেল ফারিয়া মাহাবুব পিয়াসা, মরিয়ম আক্তার মৌসহ তাদের বেশ কয়েকজন সহযোগীকে।

নানা কারণে আলোচিত–সমালোচিত এসব ব্যক্তির বাসা–অফিস থেকে বিদেশি মদ ও মাদকদ্রব্য উদ্ধারের কথা বলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। র‍্যাব বলছে, চিত্রনায়িকা পরীমনির বাসার শয়নকক্ষ থেকে ১৯টি বিদেশি মদের বোতল জব্দ করা হয়েছে।

আর বারিধারায় মডেল পিয়াসার বাসায় একটি শপিং ব্যাগ থেকে ৭৮০টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয় বলে দাবি করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরে মরিয়ম আক্তার মৌয়ের শয়নকক্ষ থেকে ৭৫০টি ইয়াবা এবং হেলেনা জাহাঙ্গীরের গুলশানের বাসা থেকে ১৮ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে।

প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজের বনানীর অফিস থেকে ৯৭০টি ইয়াবা জব্দ করা হয় বলে দাবি র‌্যাবের। র‌্যাবের ভাষ্য, কথিত ব্যবসায়ী শরফুল হাসান ওরফে মিশু হাসানের বসুন্ধরা এলাকার একটি ফ্ল্যাটের ওয়ার্ডরোব থেকে ৭ হাজার ২০০টি ইয়াবা বড়ি জব্দ হয়।

পুলিশ ও র‌্যাবের পক্ষ থেকে করা মামলায় বলা হয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এসব অভিযান চালানো হয়। তবে প্রত্যেক আসামির আইনজীবী আদালতে দাবি করেছেন, বাসা থেকে মাদক পাওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। আদালত উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে প্রত্যেক আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন। চিত্রনায়িকা পরীমনিসহ অন্য আসামিরা এখন পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, মাদকসহ কোনো ব্যক্তি হাতেনাতে গ্রেপ্তার হলে সেই মামলা ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।

এই আইনের ৩৩ ধারায় বলা হয়েছে, মাদক ব্যবসা করে কোনো ব্যক্তি যদি অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন, তাহলে আসামির ব্যাংক হিসাব বা আয়কর বিবরণী বা সম্পদের কর–সম্পর্কিত যাবতীয় রেকর্ডপত্র যাচাই-বাছাই প্রয়োজন মনে করলে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে ব্যবস্থা নিতে পারবেন তদন্ত কর্মকর্তা। সংশ্লিষ্ট আসামির ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (নিষ্ক্রিয়করণ) বা সম্পদ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য আদালতের কাছে অনুমতি চাইতে পারবেন তিনি।

পরীমনির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ

চিত্রনায়িকা পরীমনির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়েছে। মামলার বাদী হলেন র‌্যাব-১–এর কর্মকর্তা মো. মজিবর রহমান। এই মামলায় মজিবর অভিযোগ করেন, ৪ আগস্ট তিনিসহ র‌্যাব-১–এর সদস্যরা গুলশান-১ গোলচত্বরে অবস্থান করছিলেন। বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারেন, বনানীর একটি বাসায় পরীমনি সহযোগী আশরাফুল ইসলাম দিপুর মাধ্যমে বিদেশি মদ সংগ্রহ করে নিজের বাসায় মজুত রেখেছেন।

তারা বাসায় অবস্থান করছেন। পরে বাসার পঞ্চম তলায় অভিযান চালিয়ে পরীমনির বাসার শয়নকক্ষ থেকে নারী র‌্যাব সদস্যদের সহায়তায় তাকে আটক করা হয়। পরীমনির দেখানোমতে শয়নকক্ষের একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতর থেকে বিদেশি মদ জব্দ করা হয়।

এ ছাড়া শয়নকক্ষ থেকে একটি সাদা জিপারে রাখা চার গ্রাম আইস বা ক্রিস্টালমেথ জব্দ করা হয়। আরও জব্দ করা হয় এক ব্লট এলএসডি মাদক। চিত্রনায়িকা পরীমনির বাসা থেকে বিদেশি মদসহ অন্যান্য মাদকের মোট দাম দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৭ হাজার টাকা।

মামলায় বলা হয়, পরীমনি এসব মদ কবির নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে সংগ্রহ করে বাসায় রাখতেন। মামলায় কবিরের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা উল্লেখ নেই।

একই মামলায় আবার র‌্যাব দাবি করেছে, চিত্রনায়িকা পরীমনিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, তিনি প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজের কাছ থেকে মদ সংগ্রহ করতেন। তবে পরীমনি ও আশরাফুল ইসলামের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেছেন, র‌্যাব বাসায় মদ পাওয়ার অভিযোগে যে মামলা করেছে, তা সঠিক নয়।

আদালত মদের উৎসসহ নানা বিষয় উদ্‌ঘাটনের জন্য পরীমনিকে চার দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন। বনানী থানায় করা মাদক মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ইতিমধ্যে সিআইডির একটি দল পরীমনির বাসায় অভিযান চালিয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের যে ধারায় পরীমনির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পারলে তার সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড হতে পারে।

পিয়াসার মামলা

কথিত মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসাকে তার বারিধারার ভাড়া বাসার থেকে গত ১ আগস্ট গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন ডিবির এসআই শাহিদুল ইসলাম।

মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, সেদিন রাত ৯টা ২৫ মিনিটে গুলশানের নতুনবাজার এলাকায় অবস্থান করার সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারেন, কতিপয় মাদক ব্যবসায়ী অবৈধ মাদক কেনাবেচার জন্য বারিধারার বাসায় অবস্থান করছেন। তখন রাত ১০টার সময় ফারিয়া মাহাবুবকে আটক করেন।

পর তাঁর ভাড়া বাসার উত্তর-পূর্ব কোনায় চারটি হুক্কা, একটি শপিং ব্যাগের ভেতর ইয়াবা দেখতে পান। আর রান্নাঘর থেকে আট বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়।


মামলায় আরও বলা হয়, ফারিয়া মাহাবুব জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, এই অবৈধ কাজে তাঁর সহযোগী আছেন আরও দুই থেকে তিনজন। তবে ফারিয়া মাহাবুবের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেছেন, তাঁর বাসায় কোনো মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়নি।

উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে আদালত প্রথম দফায় ফারিয়াকে তিন দিন এবং পরে আরও আট দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলাটিও তদন্ত করছে সিআইডি। তাঁর বিরুদ্ধে করা পৃথক তিনটি মাদক মামলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে ১৫ বছর কারাদণ্ড হতে পারে।

মৌয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ

মরিয়ম আক্তার মৌয়ের মোহাম্মদপুরের ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে গত ১ আগস্ট রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন ডিবির পরিদর্শক শিশির কুমার কর্মকার।

মামলায় তিনি বলেন, সেদিন মাদক উদ্ধার অভিযানে বের হয়ে তারা ফার্মগেট এলাকায় অবস্থান করছিলেন। রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারেন, কতিপয় মাদক ব্যবসায়ী মোহাম্মদপুরের বাবর রোড এলাকার নিচতলার একটি বাসায় মাদক কেনাবেচার জন্য অবস্থান করছেন। তখন সেখানে অভিযান চালিয়ে মরিয়ম আক্তারকে গ্রেপ্তার করেন।

তার শয়নকক্ষের একটি ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে ৭৫০টি ইয়াবা জব্দ করেন। আর ১২ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করেন। মরিয়ম আক্তারের আইনজীবীরাও আদালতে দাবি করেছেন, ষড়যন্ত্র করে তাঁকে মাদক মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।

আদালত উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে প্রথম দফায় মৌকে তিন দিন এবং পরের দফায় চার দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে পাঁচ বছর কারাদণ্ড হতে পারে।

হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ৬ মামলা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এবারের অভিযান শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগের উপকমিটি থেকে বহিষ্কার হওয়া হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে। গত ২৯ জুলাই রাতে তার গুলশানের বাসায় অভিযান চালায় র‍্যাব।

তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, বন্য প্রাণী নিয়ন্ত্রণ আইন ও প্রতারণার অভিযোগে ছয়টি মামলা হয়েছে।

এ ছাড়া কথিত ব্যবসায়ী শরফুল হাসান ওরফে মিশুর বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে তিনটি মামলা হয়েছে। মাসুদুল ইসলাম ওরফে জিসানের বিরুদ্ধেও মাদক, বিশেষ ক্ষমতা, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে।

সর্বশেষ পরীমনির কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ করিম জিমির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে তাকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে। জুনায়েদের কাছ থেকে ২২৫টি ইয়াবা উদ্ধার হয় বলে পুলিশ দাবি করেছে।

Leave a Reply