২০ বছরের শিক্ষক এখন বর্গা চাষি

11

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী: মাথার উপরে ঝুম বৃষ্টি। একটুকুও বিরাম নেই। কাকভেজা হয়ে হে^টে যাচ্ছিলেন চশ্লিশোর্ধ আনোয়ারুলল ইসলাম। জীর্ণশীর্ণ চেহারা। পাক ধরেছে চুলে। বয়স চেনার উপায় নেই।

মলিনটা একেবারেই মুখ। বৃহস্পতিবার (১২ আগস্ট) দুপুরের ব্যাগ হাতে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন রাজশাহীল আঞ্চলিক শিক্ষা দপ্তর থেকে।

পিছু নিয়ে আলাপ, তার পর কথা। সল্প পরিচয়েই যাপিত জীবনের উপখ্যান এক নি:শ্বাসে পড়ে ফেললেন তিনি।

আনোয়ারুল ইসলামের বড় পরিচয় তিনি শিক্ষক। ২০ বছর ধরে জেলার তানোর উপজেলার দুবইল উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করেন। এটুকুতেই সার!

ওই পদে এমপিও না থাকায় তিনি এখন বর্গা চাষি। হারাতে বসেছে তার শিক্ষক পরিচয়। দুই ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে নিদারুণ কষ্টের দিন যাপন এখন।

মুহূর্তেই বাড়ল বৃষ্টির বেগ। আমিনুল ইসলাম গিয়ে আশ্রয় নিলে পাশের ছাউনিতে। কিন্তু কথা চলল, চলল আলাপ। কেবল কণ্ঠে ঝরছিলো তার বেদনা।

কথার ফাঁকে কোটরে ঢুকে যাওয়া চোখজোড়া চলছল করছিলো। হয়তো ঝরেও গেছে দু-এক ফোঁটা। তা  ঢেকে দিয়ে গেছে শ্রাবনের ধারাপাত।

আলাপকালে জানা গেলো, ছয় ভাই ও তিন বোনের মধ্যে আনোয়ারুল ইসলাম তৃতীয়। বাবা আলতাব হোসেন ছিলেন কৃষক। তাদের আদিভিটা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের ইসলামপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীনারায়নপুরে।

বিঘা সাতেক ধানি জমি থেকে সংসার চলতো তাদের। বাবা-ভাইদের সাথে তিনিও কাজ করতেন ক্ষেতে। সংসারের চাকা সচল ছিলো তাতে। সর্বনাশা পদ্মার পেটে চলে গেছে সহায়-সম্বল।

 বাস্তুচ্যুত হয়ে ভাইয়েরা যে যারমত ঠিকানা গড়েছেন। তিনিও থিতু হন তানোরের পাঁচন্দর ইউনিয়েনর যুগিশো এলাকায়। সরকারি খাস জমিতে গড়েছেন মাথা গোঁজার ঠাঁই।

১৯৯৯ সালে এলাকায় প্রতিষ্ঠা পায় দুবইল নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়। তিনি সেখানে যোগদান করেন সহকারী শিক্ষক হিসেবে। ২০১০ সালে নিম্নমাধ্যমিক স্তর এমপিওভুক্ত হয় বিদ্যালয়টির।

সর্বশেষ ২০২০ সালে মাধ্যমিক স্তরও এমপিওভুক্ত হয়। কিন্তু এমপিও বঞ্চিত রয়ে যান শিক্ষক আনোয়ারুল ইসলাম।

তার ভাষ্য, সরকারী বিধি মোতাবেল ২০০৩ সালের তিনি সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পান। শুরু থেকেই ওই পদে দায়িত্বপালন করছিলেন তিনি।

এরই ফাঁকে ২০০৯ সালে তিনি পঞ্চম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা অংশ নিয়ে সমাজবিজ্ঞান (সহকারী শিক্ষক) বিষয়ে উত্তীর্ণ হন।

এরপর ২০১১ সালের ৯ আগস্ট সরকারী বিধি মেনে মাধ্যমিক স্তরে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তাকে সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি) হিসেবে এমপিও ভুক্তির আবেদন পাঠান প্রধান শিক্ষক। কিন্তু ডিগ্রি স্তরে ইংরেজি বিষয়ে তার প্রাপ্ত নম্বর ৩০০ না থাকায় সেই আবেদন বাতিল হয়ে যায়।

পরের দফা এমপিওতে তার আগের নিয়োগ সামনে এনে এমপিও আবেদন পাঠান প্রধান শিক্ষক। ফলে দুই দফা দুই রকম তথ্য দিয়ে আবেদন করায় সেইবারও তার আবেদন আটকে যায়।

অসহায় ওই শিক্ষক আরো জানান, তিনি একেবারেই ভূমিহীন। মেয়ে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছেলে চতুর্থ শ্রেণি পড়ুয়া। স্ত্রীও অসুস্থ।

সামান্য জমি বর্গা চাষ করে কোনো রকমে পেতের তলায় ভাতের জোগাড় করেন তিনি। সন্তানদের পড়া-লেখা, পরিবারের ভরনপোষন টানা তার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

করোনা মহামারি সংকট বাড়িয়েছে আরো। তার দিন থমকে গেছে একেবারেই। পরিবার নিয়ে প্রাণে বাঁচতে এমপিওভুক্তির আকুতি জানিয়েছে এই শিক্ষক।

 বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, শুরু থেকেই তিনি বিদ্যালয়টিতে দায়িত্বপালন করছেন। মাধ্যমিক স্তরে তার সর্বশেষ নিয়োগ থাকায় নিম্নমাধ্যমিক স্তরে তাকে শিক্ষক হিসেবে দেখানো হয়নি।

তার সেই নিয়োগের এমপিও শর্ত পুরণ না হওয়ায় বাতিল করে দেন আঞ্চলিক উপপরিচালক। পরের দফা তার আগের নিয়োগ সামনে এনে আবেদন করা হয়।

ওই নিয়োগের সময় এমন কোনো শর্ত ছিলোনা। কিন্তু দু-বার পৃথক আবেদনের কারণে সেটিও বাতিল হয়ে যায়। তার জন্য তিনি অনেক চেষ্টা করেও কিছুই করতে পারেননি।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের রাজশাহীর উপপরিচালক ড. শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী জানিয়েছেন, সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি) হিসেবে এমপিওভুক্তির জন্য তার শর্ত পুরণ না হওয়া আবেদনটি বাতিল করা হয়েছে। এরপর তিনি পুরনো নিয়োগ দেখিয়ে ফের এমপিওভূক্তির আবেদন করে।

কিন্তু দুই বার দুইরকম তথ্য দিয়ে আবেদন করায় বিয়ষটি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরী হয়েছে। ওই শিক্ষক বিষয়টি নিয়ে এসেছিলেন। এবিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সু্পষ্ট মতামত পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া যাবে।

Leave a Reply