১২২ বছর বয়সেও সুস্থ রাম পিরিত

স্টাফ রিপোর্টার: ১২২ বছর বয়স নওগাঁর রাম পিরিত রবিদাসের। জেলার ধামইরহাট পৌরসভার চকযদু মহল্লার বাসিন্দা তিনি। 

এই বয়সেও সকাল হলেই লাঠি হাতে হাঁটতে বেরিয়ে পড়েন। মুক্ত বাতাসে প্রাণ খুলে শ্বাস নেন। 

অন্যোর সাহায্য ছাড়াই চলাফেরা করেন। নিজের কাজ নিজেই করেন, সহায়তা করেন পরিবারের টুকটাক কাজেও। 

প্রয়োজন না হলে পড়েন না চশমা। যেন এখনও তিনি এক দূরন্ত যুবক। বয়সের ভারে কিছুটা নতজানু হলেও মনের শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের জোড়ে এখনও সচল ১২২ বছর বয়সী রাম পিরিত রবিদাস।

চার প্রজন্মের সাক্ষী রাম পিরিত রবিদাস উত্তরের সীমান্তবর্তী নওগাঁর ধামইরহাট পৌরসভার চকযদু মহল্লার বাসিন্দা। তার মা, বাবা ও ছোট ভাই অনেক আগেই মারা গেছেন। প্রিয়তমা স্ত্রীকেও হারিয়েছেন ৩৫ বছর আগে।

সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় তিনি আজও সচল। পরিবার পরিজন নিয়ে ভালো থাকলেও রবিদাসের মনের গহীনে ফেলে আসা শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের অজশ্র স্মৃতি নাড়া দেয়।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১৮৬৮ সালের দিকে ভারতের বিহার রাজ্যের ছাপড়া জেলার সনপুর গ্রাম থেকে পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে রাম পিরিত রবিদাসের বাবা গোধন রবিদাস ধামইরহাটে পরিবারসহ পাড়ি জমান। এরপর চকযদু মহল্লায় জমি কিনে বসবাস করা শুরু করেন।

সেখানকার মাটিতে বেড়ে ওঠেন রবিদাস। ১৯০৫ সালের দেশ ভাগ, ১৯১১ সালে দুই বাংলার এক হওয়ার সেই সব কিংবদন্তি ইতিহাস তিনি শুনেছেন বাপ-দাদার কাছ থেকে। তখন তিনি ছোট। এরপর  ৫২’র ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সব কিছুর জ্বলন্ত সাক্ষী রাম পিরিত রবিদাস। সবই তার মনে জ্বলজ্বল করে।

তার ১২২ বছরের জীবনে কত পরিচিত, বাবা-মা, ভাই, স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব ও ভালোবাসার মানুষ ছিলেন। কিন্তু এক এক করে হারিয়েছেন সবাইকেই। সেই শিশুকাল থেকে যাদের দেখে বড় হয়েছেন কিংবা যাদের ভালোবাসায় নিজেকে সিক্ত করেছেন, তারা কেউ আর নেই।

দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক রবিদাস। সন্তানদের বিয়ে দিয়েছেন, তাদেরও পরিবার হয়েছে। এমনকি নাতি-নাতনিরও সন্তান হয়েছে। তাদের সঙ্গে পরম সখ্যতায় কাটে রবিদাসের জীবনের শেষ সময়গুলো। সব মিলে চার প্রজন্মের সাক্ষী রাম পিরিত রবিদাস।

রবিদাস বলেন, ‘আমার জন্ম সেই ১৮৯৯ সালে। এই জীবনে কতো কিছু দেখলাম। ব্রিটিশরা এলো, শাষন করলো শোষণও করলো। কিন্তু টিকতে পারলো না, চলে গেলো। এরপর পাকিস্তানিরা আসলো। তারাও শোষণ করেছে। মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছে। পারেনি।

আমরা মায়ের ভাষায় এখনো কথা বলি। এ এক পরম পাওয়া। তারপর তো ৭১ এ যুদ্ধ লেগে গেলো। আমরা তখনও দেশ ফিরে পেলাম। এটা আমাদের জন্য আশির্বাদ।

এসব এখনো চোখে জ্বলজ্বল করে। মনেহয়, এই তো সেদিন। এসবের মধ্যেও বেঁচে আছি, এতো সৃষ্টিকর্তার পরম কৃপা। নইলে কবে আমার দেহ চিতায় পুড়ে ছাঁই হয়ে যেত।’

রাজেন্দ্রনাথের স্ত্রী বাসন্তী রানী বলেন, ‘আমার দাদাকে ছোট বেলায় হারিয়েছি। দাদা শ্বশুর এখনও বেঁচে আছেন এটা অনেক বড় একটি পাওয়া। সবাই তার জন্য আর্শিবাদ করবেন।’

নওগাঁ জেলা মানবসেবা সংস্থার সভাপতি রাসেল মাহমুদ জানান, রাম পিরিত রবিদাস এলাকার সবার কাছে দাদু নামেই পরিচিত। সবাই তাকে ভালোবেসে দাদু বলে ডাকে। রবিদাসের পরিবার আসলেই খুব সৌভাগ্যবান।

বর্তমানে পরিবারের বয়ষ্ক মানুষদের অনেকেরই ঠাঁই হয় বৃদ্ধাশ্রমে। কিন্তু রবিদাসকে তার পরিবার ভালোবেসে আগলে রেখেছে। সবার এই পরিবার থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে।

ধামইরহাট উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এটিএম ফসিউল আলম জানান, রাম পিরিত রবিদাস এই এলাকার সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি। এরই মধ্যে উপজেলা সমাজসেবা অফিস থেকে তাকে বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া আমাদের অফিসে বিভিন্ন সময় এককালীন অনুদানের বরাদ্দ হয়ে থাকে। বরাদ্দ পেলে সেখান থেকে তাকে চিকিৎসা খরচসহ বিভিন্ন রকমের সাহায্যও করা হবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

Leave a Reply