তিন মাস অবরুদ্ধ গৃহবধূ, সহায়তা মেলেনি পুলিশের

স্টাফ রিপোর্টার: নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলায় আমিনা বেগম (২৫) নামে এক গৃহবধূকে তিন মাস ধরে শ্বশুরবাড়িতে অবরুদ্ধ করে নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে।

এতে দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে ওই গৃহবধূর দিন কাটছে অনাহারে-অর্ধাহারে। ঘটনার প্রতিকার চেয়ে ওই গৃহবধূর মা থানায় মামলা করতে গেলে মামলা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গৃহবধূর মা লাইলী বেগম বলেন, আমার মেয়েকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। থানায় অভিযোগ দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু অভিযোগ না নিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।

আরও পড়ুন: নিজের বন্দুকের গুলিতে প্রাণ গেল কৃষকের

এ বিষয়ে পত্নীতলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামসুল আলম শাহ বলেন, ওই পরিবারের বিষয়ে থানায় লিখিত কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি।

গৃহবধূকে নির্যাতন করা হয়েছে মর্মে তার মায়ের (লাইলি বেগম) মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে দুজন পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নির্যাতিত আমিনা বেগমের স্বামীর নাম ফারুক ইসলাম ফেন্সি (৪৫)। তাদের দুই সন্তান ফারহানা ফিন্নি (৫) ও ফারিয়া আক্তার রাখি (২)। ফেন্সি ব্রুনাইপ্রবাসী। তিনি টাকার বিনিময়ে বিদেশে লোক পাঠান। তাদের বাড়ি উপজেলার নজিপুর পৌরসভার হরিরামপুর পশ্চিমপাড়ায়।

আমার দুই মেয়ে আছে। তা ছাড়া মা-বাবার কাছ থেকে এত টাকা এনে স্বামীকে দিয়েছি। পরকীয়ায় জড়িয়ে পরিবারের বুদ্ধিতে আমাকে বিদেশে বসে তালাক দিলেই তো হয়ে যায় না। আমার স্বামী দেশে এলে এসব নিয়ে কথা হবে। কিন্তু আমাকে বন্দী করে নির্যাতন করা হচ্ছে। ভুক্তভোগী গৃহবধূ আমিনা বেগম

আরও পড়ুন: র‌্যাবের কব্জায় ১০ পর্নো ভিডিও সরবরাহকারী 

গৃহবধূর পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আট বছর আগে ধামইরহাট উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের ভেড়ম সোনাদিঘী গ্রামের মৃত আব্দুল হাইয়ের ছেলে ফারুক ইসলাম ফেন্সির সঙ্গে পত্নীতলা উপজেলার আকবরপুর ইউনিয়নের বনী গ্রামের লুৎফর রহমানের মেয়ে আমিনা বেগমের বিয়ে হয়।

মেয়ের সুখের জন্য বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে দুই লাখ টাকা দেন তার বাবা। বিয়ের দুই বছর পর ফারুক স্ত্রী আমিনাকে ব্রুনাই নিয়ে যান। সেখানে নেওয়ার পর স্ত্রীর ওপর বিভিন্ন নির্যাতন চালান ফারুক।

এদিকে কর্মসংস্থান করে দেওয়ার কথা বলে তার এলাকার বিভিন্ন বেকার মানুষকে ব্রুনাই নিয়ে যান ফারুক। এর মধ্যে যারা গেছেন, তাদের অনেকেই প্রতারিত হয়ে দেশে ফিরে আসেন।

আরও পড়ুন: মাতাল হয়ে সশস্ত্র বিএসএফ জওয়ান বাংলাদেশে

কয়েক বছর আগে পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর পৌরসভার হরিরামপুর পশ্চিমপাড়ায় জমি কিনে সেখানে চারতলা ভবন নির্মাণ করেন ফারুক। সেখানে স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন। এ সময় দুই সন্তান ফারহানা ফিন্নি ও ফারিয়া আক্তার রাখির জন্ম নেয়। শাশুড়ি লাইলী বেগম ও শ্যালিকা তাদের সঙ্গে বসবাস করতেন।

সর্বশেষ তিন বছর আগে ফারুক দেশে এসেছিলেন। এক বছর আগে এক ব্যক্তিকে বিদেশ নিয়ে যান। এই সুযোগে ওই ব্যক্তির স্ত্রীর সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে।

মোবাইল নম্বরে ওই নারীর সঙ্গে শুরু হয় পরকীয়া। এরপর থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে বিদেশ থেকে মোবাইলের মাধ্যমে ফারুক তার স্ত্রীকে তালাক দেন।

আরও পড়ুন: পত্নিতলায় স্কুল আছে রাস্তা নেই

সূত্র আরও জানায়, এরপর গত তিন মাস ধরে ফারুক তার মাকে তার বাসায় এনে রেখেছেন। তার মা বাসার মূল দরজা সব সময় তালাবদ্ধ করে রাখেন। এতে বাসার বাইরে বের হতে পারেন না আমিনা। তার সন্তান স্কুলেও ঠিকমতো যেতে পারছে না। এমনকি তাদের ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হচ্ছে না।

গত সোমবার (২৮ মার্চ) বড় মেয়ে ফারহানা ফিন্নি স্কুলে যাবে, এ জন্য শাশুড়িকে দরজা খুলতে বলা হয়। কিন্তু উল্টো ক্ষিপ্ত হয়ে শাশুড়ি, নন্দু মিন্টু, পরাগ, বদুল, সাগর ও ম্যানেজার বেলাল আমিনাকে মারধর করে। এতে তার নাক ফেটে রক্ত বের হয়। চিকিৎসাও নিতেও দেওয়া হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান এর আগে সালিস বৈঠক করেছেন। সেখানে খাওয়া-পরা ও মেয়েদের পড়াশোনা বাবদ মাসে ১২ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু তিন মাসে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা তাদের দেওয়া হয়েছে বলে জানান গৃহবধূর মা লাইলি বেগম।

আরও পড়ুন: সহয়তা পেলে উঠে দাঁড়াবেন প্রতিবন্ধী কালাম

লাইলী বেগম আরও বলেন, মেয়েকে ব্রুনাই নিয়ে যাবে, এ জন্য সে সময় ৬০ হাজার টাকা খরচ করে মেয়ের ভিসা ও পাসপোর্ট করে দিই। মেয়ের সঙ্গে আমাকে থাকার জন্য জামাই অনুরোধ করেছিল।

পরে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আমাদের জায়গা-জমি বিক্রি করে ফারুককে প্রায় ২৯ লাখ টাকা দিলে সে নজিপুর শহরে জমি কিনে বাড়ি নির্মাণের কাজে খরচ করে।

আমি চার বছর ধরে মেয়ের সঙ্গে ছিলাম। তিন মাস ধরে আমার মেয়ের ওপর তার শাশুড়ির ও আত্মীয়স্বজন নির্যাতন করছে। আমার মেয়েকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন: উঠে পড়ল ভটভটি, পথেই ঝরল প্রাণ

ভুক্তভোগী আমিনা বেগম বলেন, আমার স্বামী পরকীয়ায় জড়িত হওয়ার পর থেকে মূলত সংসারে অশান্তি শুরু হয়েছে। আমার স্বামী বিদেশে বসে কয়েক দিন আগে তার ম্যানেজার বেলালকে দিয়ে পরকীয়ায় লিপ্ত ওই নারী নিপাকে আমার বাসায় জোর করে এনে রাখে।

এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে আমাকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন নির্যাতন করেছে। পুলিশকে ফোন করেছিলাম কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আমার জীবন নিয়ে আমি শঙ্কায় আছি।

চার মাস আগে ওই পরিবারের বিষয়ে উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে স্ত্রীর ভরণপোষণ ও বাচ্চাদের পড়াশোনা বাবদ মাসে ১২ হাজার টাকা করে দিতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তারা মেনেও নিয়েছে।

এ ছাড়া যেহেতু ওই গৃহবধূর স্বামী বিদেশ থাকেন, তিনি দেশে ফিরে এলে তারা তাদের মতো সিদ্ধান্ত নেবেন।মো. আব্দুল গাফ্ফার, পত্নীতলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান

আরও পড়ুন: শিশুর মরদেহ মিলল মাদরাসার টয়লেটের ট্যাংক

তালাকের প্রসঙ্গে আমিনা বলেন, আমার দুই মেয়ে আছে। তা ছাড়া মা-বাবার কাছ থেকে এত টাকা এনে স্বামীকে দিয়েছি। পরকীয়ায় জড়িয়ে পরিবারের বুদ্ধিতে আমাকে বিদেশে বসে তালাক দিলেই তো হয়ে যায় না। আমার স্বামী দেশে এলে এসব নিয়ে কথা হবে। কিন্তু আমাকে বন্দী করে নির্যাতন করা হচ্ছে।

তবে আমিনা বেগমের শাশুড়ি ফাতেমা বেগম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ছেলে বিদেশ থাকে। ছেলের কথায় তিন মাস থেকে তার বাসায় থাকছি। ছেলের বউকে কোনো ধরনের নির্যাতন করা হয়নি। বরং আমাকেই মারধর করেছে ছেলের বউ। এ ছাড়া আমার ছেলে অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িত না।

বাসার মূল দরজায় তালা দেওয়া, নাতনিদের স্কুলে যেতে না দেওয়া ও খাবার দেওয়া হয় না কেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সব সময় দরজা না খোলার জন্য ছেলের নিষেধ আছে। নাতনি নিয়মিত স্কুলে যায়। আর খাবার না দিলে তারা এত দিন বেঁচে আছে কীভাবে?

নাম প্রকাশ না করে স্থানীয় কয়েকজন বলেন, ফারুক ইসলাম এক নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। এরপর থেকে এ সংসারে অশান্তি শুরু হয়েছে। বেশ কিছুদিন থেকে আমিনা বেগমের কান্না ও চিৎকার শোনা যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: শাক কুড়াতে বেরিয়ে প্রাণ গেলো বৃদ্ধার

বাসায় কিছুদিন থেকে ফারুকের মা (ফাতেমা) আছেন। ছেলে যা বলে তিনি তা-ই করেন। সব সময় বাসার মূল দরজায় তিনি তালা লাগিয়ে রেখেছেন। আমিনা বেগমের দুই মেয়ে আছে। তাদেরকে ঠিকমতো স্কুলে যেতে ও খাবারও দেওয়া হচ্ছে না।

ফারুক বিদেশ থাকে কিন্তু কয়েক দিন আগে পরকীয়ায় জড়িত ওই নারী এ বাসায় এসেছিল। এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার বলে মনে করি আমরা।

পত্নীতলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল গাফ্ফার বলেন, চার মাস আগে ওই পরিবারের বিষয়ে উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে স্ত্রীর ভরণপোষণ ও বাচ্চাদের পড়াশোনা বাবদ মাসে ১২ হাজার টাকা করে দিতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তারা মেনেও নিয়েছে। এ ছাড়া যেহেতু ওই গৃহবধূর স্বামী বিদেশ থাকেন, তিনি দেশে ফিরে এলে তারা তাদের মতো সিদ্ধান্ত নেবেন।

Leave a Reply