স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী: সবেমাত্র সপ্তম শ্রেণিতে উঠেছিলেন বাবেয়া আক্তার সাথী। বয়স তখন তেরো। ওই বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাকে। আর সতেরো বছরেই হন দুই সন্তানের মা।  

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী: সবেমাত্র সপ্তম শ্রেণিতে উঠেছিলেন বাবেয়া আক্তার সাথী। বয়স তখন তেরো। ওই বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাকে। আর সতেরো বছরেই হন দুই সন্তানের মা।  

অভাবের সংসারে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরুতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু লক্ষ্য পুরণে ঠিকই এগিয়েছেন বহুদূর। রাজশাহী নগরীর মথুরডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা সাথী এখন সফল দুগ্ধ খামারি।

তার বাবার বাড়ি নগরীর উপকণ্ঠ পবার পারিলা ইউনিয়নের মাড়িয়া দক্ষিণপাড়ায়। সেখানেই গড়ে তুলেছেন সাথী ডেইরি ফার্ম। সকল প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে সতোরো বছর ধরে লেগে থাকার ফল পেয়েছেন অদম্য এই নারী।

সোমবার (৭ মার্চ) দুপুরে খামারেই গিয়ে পাওয়া গেলো সাথীকে। খামারে কাজ করছিলেন তিনি। কাজের ফাঁকেই কথা হয় এই নারী খামারির সাথে। গৃহিনী থেকে কিভাবে পুরোদুস্তর খামারি হয়ে উঠছেন সেই গল্প শুনিয়েছেন ঢাকা পোস্টকে।

সাথী জানান, তার খামারে স্থায়ী কোনো কর্মী নেই। তিনি নিজ হাতেই খামারের সব  কাজ দেখাশোনা করেন। দুধও দোহন করেন নিজেই। স্বামী এবং ছেলে-মেয়েরা খামারের টুকিটাকি কাজে সহায়তা করেন। সবার পরিশ্রমে এতো দূর এসেছেন সাথী।

পাঁচ বোনের মধ্যে সাথী ছিলেন দ্বিতীয়। ২০০০ সালে তিনি সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। মাত্র তেরো বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে যায় তার। বিয়ের সময় স্বামী মো. সোহাগ ছিলেন একেবারেই বেকার। বিয়ে পর স্যানেটারি মিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করেন।

অভাবের সংসারে অনটন লেগেই ছিল। বছর দুয়েকের মাথায় কোলজুড়ে আসে মেয়ে সুমাইয়া খাতুন। মেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি আসার সময় মা দুধেল গাভি উপহার হিসেবে দেন। সেই থেকে শুরু। মেয়ে সুমাইয়া রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তার বয়স এখন ১৭। ১৭ ছুঁলো খামারের বয়সও। ফুলে ফেঁপে উঠেছে খামার। অনেকটা কষ্ট করেই এতো দূর এসেছেন।

দীর্ঘ এই যাত্রার পথটা সহজ ছিলোনা জানিয়ে সাথী বলেন, শ্বশুরবাড়ি মথুরডাঙায় তার খামারে সাতটা গাভি গিয়ে দাঁড়ায়। এরপর বাবার বাড়ির পাশে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমিতে খামার সরিয়ে নেন। এখন তার খামারে ১৪টি গাভি এবং ১২টি বাছুর।

সবগুলো গাভি দুধ দিচ্ছে। কিছু গাভিনও রয়েছে। দৈনিক প্রায় ১১০ লিটার দুধ পাচ্ছেন। দুধের প্রধান ক্রেতা স্থানীয় মিস্টি প্রস্তুতকারীরা। তাছাড়া নির্ধারিত কিছু ক্রেতাও রয়েছে।  

সাথী জানান, নিজস্ব অটোরিকশায় প্রতিদিন দুই বেলা খামারে আসেন তিনি। দুধ দোহনের পর তাতে করেই দুধ নিয়ে যান নরীর বাড়িতে। সেখান থেকেই ক্রেতারা দুধ সংগ্রহ করেন।

সাথী আরও জানান, এখন খাবারের দাম বাড়তি। অন্যান্য খরচও বেড়েছে। তবুও যাবতীয় খরচা বাদে খামার থেকে তার মাসে আয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা। সংসার ও সন্তানদের পড়াশোনার খচর আসে খামার থেকেই। কিছু টাকা সঞ্চয়ও করেন। কিছু জমিও কিনেছেন খামারের আয় থেকে পয়সা বাচিয়ে।

করোনাকালে দুধ বিক্রি নিয়ে সমস্যায় পড়েছিলেন জানিয়ে সাথী বলেন, করোনকালে তারা কঠিন সময় কাটিয়েছেন। লকডাউনে মিস্টির দোকানগুলো বন্ধ ছিল। তারা দুধ নেয়নি। সাধারণ ক্রেতাও পাওয়া যাচ্ছিলনা। নিরুপায় হয়ে বাড়ির পাশের কাঁচা বাজারে একাই দাড়িয়ে দুধ বিক্রি করেছেন।

কেবল গরুর খাবার জোগাতে মাত্র ৩০টাকা কেজি দরে দূধ বিক্রি করেছেন। কিছু পরিচিত ক্রেতা ছিল। তাদের বাড়ি বাড়ি দুধ পৌছে দিয়েছেন। কোনো রকমে টিকে ছিলেন ওই সময়টাই। এখন ওই সংকট নেই।

দুপুরে অটোরকিশা করে খামারে গোখাদ্য আনলেন মো. সোহাগ। ছেলে সাব্বিরের সাথে ধরাধরি করে বস্তাগুলো নামিয়ে রাখলেন খামারে শেডে। মাঝেমধ্যেই খামারের টুকটাক কাজ করেন বাবা-ছেলে।

মো. সোহাগ জানান, তার বাবা-দাদারাও একটা সময় গরু পালন করতেন। কিন্তু তার গরু ছিলনা। বিয়ের পর শাশুড়ি গরু উপহার দেন। সেই থেকে গরু পালন শুরু। প্রথমে দেশি গরু ছিল। পরে উন্নতজাতের দুধের গরু কেনেন। ঋণ নিয়ে ধীরে ধীরে খামারের পরিসর বাড়ান। বর্তমানে গোখাদ্যের দাম বেড়েছে। খামার টেকানো মুশকিল।

স্বামীর সুরে সুর মেলালেন সাথী। তিনি বলেন, খাবারের দাম বাড়লেও  দুধের দাম বাড়ানো যাচ্ছেনা। দাম বাড়ালেই ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছেনা। বাধ্য হয়ে আগের দামেই দুধ বিক্রি করতে হচ্ছে।

আবার বেশি দুধ উৎপাদনেও বাজার নিয়ে সমস্যা দাঁড়ায়। মিস্টির কারখানাতে দুধ দিলে লাভও কম আসে। তার চিন্তা আছে. নিজেই মিস্টির কারখানা গড়ে তুলবেন। যাবতীয় দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন করবেন সেখানে।

উল্টো স্রোতে চলা সাথী এখন এলাকার নারীদের অনুপ্রেরণা। বিষয়টি ভাবতে ভালোই লাগি তার। সাথী বলেন, এখনকার মেয়েরা পড়াশোনা শেষে চাকরির চেষ্টা করেন। চাকরি না পেলে কেবল স্বামী-সংসার নিয়েই ব্যস্ত থাকেন।

কেউ কেউ ব্যবসায় নামছেন এখন। কিন্তু খামারে নামছেন-এমন নারীর সংখ্যা কম। অনেকেই এই কাজটা নোংরা ভাবেন। খামার গড়ে তোলা কষ্ঠসাধ্য। কিন্তু অসাধ্য নয়।

সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে তিনি খামার গড়ে তুলেছেন। যেসকল নারী সল্প শিক্ষিত কিংবা সংসার অসচ্ছল, তারা খামার গড়ে ভাগ্য বদলাতে পারেন। লেগে থাকলে সফলতা আসবেই-মনে করেন সাথী।

ছেলে সাব্বির আহমেদ নগরীর আটকোশি উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি মায়ের খামারে সময় দেয়। বিষয়টি তার ভাল্ই লাগে। সাব্বিরের স্বপ্ন, ভবিষ্যতে সে ইঞ্জিনিয়ার হবে। বাবা-মা তাকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেন, সেই স্বপ্ন পুরণ করতে চায় সে।

মেয়ের সাফল্যে খুশি সাথীর মা রোকেয়া বেগম। তিনি বলেন, পাঁচ মেয়ের প্রত্যেককেই বিয়ের পর উপহার হিসেবে গরু দিয়েছেন। মেয়েদের সুখের কথা চিন্তা করেই গরু দিয়েছেন তিনি। বাকি চার মেয়ে যে যারমত গরুগুলো বিক্রি করে দেন।

কেবল ধরে রেখেছিল সাথি। গরুর দুধ ও বাছুর বিক্রি করে ধীরে ধীরে তার খামারের পরিসর বাড়িয়েছে। খামার করতে গিয়ে মেয়ের অনেক ঋণ হয়েছে জানিয়ে সেই ঋণ শোধ হলে মেয়ের সুখের আশা দেখছেন মা।

Leave a Reply