বছরজুড়ে কি চাষ, আমনেই সিদ্ধান্ত 

স্টাফ রিপোর্টার: বরেন্দ্র খ্যাত রাজশাহী অঞ্চলের জমি ছিল এক ফসলি। খরা পিড়ীত এই অঞ্চলের চাষাবাদ ছিল বৃষ্টি নির্ভর। কিন্তু সেচের সংস্থান হওয়ায় এখন সেইসব জমিতে ফলছে তিনটি ফসল। বছরজুড়েই ফলছে ধান।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোন জমিতে কৃষক কি ফসল ফলাবেন, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমন মৌসুমেই। আর এ জন্য আমন মৌসুমে সল্প মেয়াদি জাত আবাদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে চাষিদের। কেবল আমনই নয়, রবি ফসল, আউস কিংবা বোরোতেও এখন স্বল্প মেয়াদি জাত উদ্ভাবন করেছেন দেশের বিজ্ঞানীরা।

আষাঢে বীজতলায় বীজ বোনার মাধ্যমে রোপা আমন মৌসুম শুরু করেন চাষি। সেই চারা জমিতে রোপন হয় শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে। এলাকা ভেদে কার্তিক-অগ্রহায়ণ-পৌষে ধান ওঠে ‍কৃষকের গোলায়। চিরায়ত এই কৃষিতেই অভ্যস্ত রাজশাহী অঞ্চলের চাষিরা।

রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে রাজশাহী কৃষি অঞ্চল। আঞ্চলিক কৃষি দপ্তরের হিসেবে, ২০০৮-২০০৯ মৌসুমে এই চার জেলায় রোপা আমন ছিল ৪ লাখ ৭ হাজার ১৮০ হেক্টর। ওই মৌসুমে কৃষকের গোলায় উঠেছে ১০ লাখ ১৮ হাজার ১১২ টন।

সেইবার রাজশাহীতে ৮৬ হাজার ৭৮০ হেক্টরে ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৭০ টন, নওগাঁয় ২ লাখ ৯ হাজার ১০ হেক্টরে ৫ লাখ ১৪ হাজার ২৮৫ টন, নাটোরে ৫৫ হাজার ৪৫০ হেক্টরে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৭২১ টন এবং চাঁপাইনবাবঞ্জে ৫৫ হাজার ৯৪০ হেক্টরে ১ লাখ ৩০ হাজার ৩৩৬ টন ধান উৎপাদন হয়েছে।

সর্বশেষ গত আমন মৌসুমে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৯২৯ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ছিল। তাতে ফলন হয়েছে ১২ লাখ ৭ হাজার ৯৯২ টন।

এর মধ্যে রাজশাহীতে ৭৭ হাজার ৯৬ হেক্টরে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৫৯ টন, নওগাঁয় ১ লাখ ৯১ হাজার ৬৬৪ হেক্টরে ৫ লাখ ৯ হাজার ৪৩৫, নাটোরে ৬৩ হাজার ৯৫৯ হেক্টরে ২ লাখ ৪ হাজার ৯৬৪ টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৩ হাজার ২১০ হেক্টরে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৩৩ টন ধান উৎপাদন হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক যুগ আগেও এই অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ জমিতে প্রচলিত ধানের চাষ হতো। কৃষি দপ্তরের প্রচেষ্টায় উচ্চ ফলনশীল জাতে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। আর তাতেই বাড়ছে ফলন।

কেবল উৎপাদনই নয়, কৃষকরা উচ্চ ফলনশীল জাতে গেলে বদলে যাবে শষ্য বিন্যাস। এমনটিই মনে করেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতনবৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও রাজশাহী কেন্দ্রের প্রধান ড. ফজলুল ইসলাম।

তিনি বলেন, এই অঞ্চলে আমন মৌসুমের জন্য উপযোগী স্বল্প জীবনকালের জাত ব্রি ধান-৮৭। বীজতলায় বীজ বোপন থেকে শুরু করে ফসল কেটে ঘরে তুলতে ১২০ থেকে ১২৫ দিন সময় লাগে। এই জাতের কাণ্ড শক্ত হওয়ায় গাছ হেলে পড়েনা। ফলে সহজেই যান্ত্রিক উপায়ে কাটা যায়।

তাছাড়া কাণ্ড লম্বা হওয়ায় খড়ও পাওয়া যায় প্রচুর। ব্রি ধান-৮৭ তুলে নির্বিঘ্নে সরিষা, ডাল ফসল অথবা আগাম আলু চাষ করা যায় । রবি ফসল তুলে সময়মত বোরো ধানও চাষ করা যায়।

সময়মত বোরো ধান চাষে আমনের জাত নির্বাচন জরুরী বলে মনে করেন এই কৃষি বিজ্ঞানী। তিনি বলেন, রাজশাহী জুড়ে সারা বছরই ধান পাকছে। আউশ ধান চাষের ক্ষেত্রে ব্রি ধান-৯৮ খুবই উপযোগী। এই ধানের ফলনও ভালো। স্বল্প মেয়াদি এই জাতের ধান তুলে আমন ধান চাষ করা যায়।

বোরো মৌসুমে ধানের জাত নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে সব জমিতে চারটি ফসল ফলানোর পরিকল্পনা আছে সেখানে স্বল্প মেয়াদি বোরো জাত নির্বাচন করতে হবে। এমন পরিকল্পনা না থাকলে জমিতে দীর্ঘ মেয়াদি বোরো জাত নির্বাচন করা যায়। তাতে ফলনও বেশি পাওয়া যাবে।

বোরোর জন্য নতুন জাত নির্বাচনে কৃষকদের পরামর্শ দেন এই বিজ্ঞানি। তিনি বলেন, নতুন উদ্ভাবিত ব্রি ধান-১০২ খুবই উপযোগী। এই ধানের ফলন ব্রি ধান-২৯ এরমতই। ব্রি ধান-২৯ এর সপ্তাখানিক আগেই পাকবে। এছাড়া ব্রি ধান-৯২ আছে। এটিও ব্রি ধান ২৯ এর মতই। বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য উপযোগী পানি সাশ্রয়ি এই জাতটি কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

এই অঞ্চলের কৃষক বোরো মৌসুমে জিরা ধান চাষ করেন। এর বিকল্প উচ্চ ফলনশীল ব্রি ধান-১০০। এটি জিংক সমৃদ্ধ একটি জাত। এছাড়া জিং সমৃদ্ধ ব্রি ধান-৮৪ চাষ করা যায়। প্রটিন সমৃদ্ধ এই ধানও জিরা ধানেরমত। এছাড়া ব্রি ধান-৮৮ ও ব্রি ধান-৮৯ চাষ করা যায় বোরো মৌসুমে।

ভারতীয় জাতের ধান চাষে কৃষখদের নিরুৎসাহিত করে এই বিজ্ঞানী বলেন, ভারতীয় ধানের জাতে রোগ-বালাই বেশি। সেই রোগ-বালাই দেশীয় উদ্ভাবিত জাতে চলে আসতে পারে। এ জন্য আমরা কৃষকদের আমাদের উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল জাতের ধান চষে উৎসাহিত করছি। ধানের বীজ উৎপাদন সহজ উল্লেখ করে কৃষকদের নিজের বীজ উৎপাদন করে সংরক্ষণের তাগিদ দেন এই কৃষি বিজ্ঞানী।

Leave a Reply