বরেন্দ্রজুড়ে চাষ ছাড়াই সরিষা, দুয়ার খুলল সম্ভাবনার

স্টাফ রিপোর্টার: বরেন্দ্র খ্যাত রাজশাহী অঞ্চলের বিস্তৃর্ণ মাঠে এখন সোনারঙা ধান। কোথাও কোথাও ধান কাটছেন কৃষক। কোথাও এখনো কাটার অপেক্ষা।

তবে সরিষা চাষের সময় যাচ্ছে বয়ে। সেই সময় কাজে লাগাতে ধানখেতেই বীজ ছড়াচ্ছেন চাষি। তাতে সময় যেমন বাঁচবে, তেমনি বাঁচবে চাষের খরচা। আর সময়মত সরিষা তুলে বোরো আবাদেও নামতে পারবেন চাষি।

উদ্যোগী কৃষকদের এই কৌশল বাতলে দিচ্ছে কৃষি দপ্তর। লাভের হিসেব কষে বিনা চাষে সরিষা আবাদে নেমেছেন বরেন্দ্র খ্যাত রাজশাহী অঞ্চলের হাজারো কৃষক।

ধানখেতে সরিষা বীজ ছড়াচ্ছিলেন রাজশাহী গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের ধামিলা এলাকার কৃষকসাহাবুদ্দিন। তার সাথে কথা হয় খেতের আইলে দাঁড়িয়ে।

তিনি জানান, তার খেতের ধান তুলতে আরও দিন দশেক সময় লাগবে। সেই ধান তুলে সরিষার বীজ বুনতে সময় লাগবে আরও বেশ কিছু দিন। কিন্তু অপেক্ষা করারমত সময় তার হাতে নেই।

ফলে এখনই ধানখেতেই সরিষার বীজ ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ধান কেটে তোলার সময় বীজ গজিয়ে যাবে। এতে তার চাষের সময় বাঁচল। সরিষা তুলে সময়মত বোরো আবাদে নামতে পারবেন।

সাহাবুদ্দিনের খেতের আইলে পাওয়া গেলো গোদাগাড়ীর দেওপাড়া ইউনিয়নের ঈশ্বরীপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অতনু সরকারকে। মুলত: তার পরামর্শে সাহাবুদ্দিনসহ এলাকার বহু কৃষক বিনা চাষে সরিষা আবাদে নেমেছেন।

অতনু সরকার জানান, এই খেতের ধান আটতে আরও ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগবে। ফলে আমরা বিনা চাষে সরষিা আবাদের পরামর্শ দিচ্ছি। এই পদ্ধতিতে এলাকার প্রায় আড়াইশ বিঘা জমিতে সরিষার চাষ হচ্ছে।

সরিষা যাতে সময়মত ওঠে এবং সেই খেতে বোরো ধান যাতে সময়মত রোপন করা যায় সেই জন্য আমরা বিনা চাষে সরিষা আবাদে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি।

তিনি বলেন, সাধারণত ধান কাটার পর জমিতে জো না থাকলে সেচ দিতে হবে। জো আসার পর চাষ দিয়ে সরিষা বুনলে ১৫ থেকে ২০ দিন লেগে যাবে। এই সময়টুকুন এগিয়ে আনতে আমরা জমিতে ধান কাটার আগেই সরিষা বীজ ছড়ানোর পরাদর্শ দিচ্ছি কৃষকদের।

সাধারণত চাষ দিয়ে আবাদে বিঘা প্রতি ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি সরিষা বীজ লাগে। কিন্তৃ বিনা চাষের ক্ষেত্রে বীজ দিচ্ছি ১ কেজি ২৫০ গ্রাম। কারণ কিছু বীজ ধানগাছে আটকে থাকতে পারে।

এই কৌশলে চাষের ক্ষেত্রে ধানে পাক ধরলে খেতে সেচ দিতে হবে। ধান কেটে ঘরে তোলার সপ্তাখানেক আগে সরিষা বীজ ছড়িয়ে দিতে হবে খেতে। ধান কাটার সময় নাড়া বড় রাখতে হবে, যেনো সরিষার গাছ ভেঙে না যাতে। ধান তোলার পর খেতে সেচ এবং সার প্রয়োগ করতে হবে।

এতে চাষের আবাদের প্রায় কাছাকাছি সরিষা উৎপাদন হবে। সরিষা চাষের এই কৌশলে কৃষকরে দুটি লাভ, একটি-চাষের খরচা বাঁচবে, সময়ও বাঁচবে। দেশে ভোজ্য তেলের চাহিদা পুরণ করতে পারবো আমরা।

আঞ্চলিক কৃষি দপ্তরের হিসেবে, ২০০৯-২০১০ মৌসুমে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সরিষা চাষ হয়ে ছিল ৬৯ হাজার ৮৪৫ হেক্টর। ওই বছর সরিষা উৎপাদন হয়েছে ৭৪ হাজার ৬৭১ টন। ওই মৌসুমে কেবল রাজশাহী জেলায় ১৯ হাজার ১০০ হেক্টরে সরিষা উৎপাদন ছিল ২১ হাজার ১০ টন।

এছাড়া নওগাঁয় ২৮ হাজার ১০০ হেক্টরে ২৮ হাজার ৫৫ টন, নাটোরে ১ হাজার ৭৫৫ হেক্টরে ১৭ হাজার ৬৭৫ টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৮ হাজার ৮৯০ হেক্টরে ৭ হাজার ১৩৪ টন সরিষা উৎপাদন হয়েছে।

গত ২০২১-২০২২ মৌসুমে এই অঞ্চলে সরিষার আবাদ ছিল ৮৬ হাজার ২৫৯ হেক্টর। তা থেকে সরিষা উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৫৩ টন। ওই মৌসুমে কেবল রাজশাহী জেলায় ২৬ হাজার ১৫৬হেক্টরে সরিষা উৎপাদন ছিল ৪০ হাজার ৮২৭টন।

এছাড়া নওগাঁয় ৩৪ হাজার ৭৪৫  হেক্টরে ৫২ হাজার ৯৪৭ টন, নাটোরে ৭ হাজার ৭৪৮  হেক্টরে ১০ হাজার ৪২৭ টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৭ হাজার ৬১০  হেক্টরে ২৪ হাজার ৭৫২  টন সরিষা উৎপাদন হয়েছে।

এবার গত বছরের চেয়ে সরিষার আবাদ ২৮ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি দপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক শামছুল ওয়াদুদ।

তিনি বলেন, রাজশাহী অঞ্চলে এবার সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৯২ হাজার ৫৮০ হেক্টর। এরই মধ্যে ১২ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমিতে সরিষা বীজ বপন হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দেশে ভোজ্য তেলের যে চাহিদা তার মাত্র ১০ শতাংশ পুরণ হয় দেশীয় ফসলে। বাঁকি ৯০ শতাংশ ভোজ্য তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।কৃষি বান্ধব সরকারের লক্ষ্য, আমদানি নির্ভরতা কমানোর বাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা। কৃষকের কাছে তেল সহজপ্রাপ্য করা।

দেশে তেলের ঘাটতি পুরণে এবার বিশেষ পরিকল্পনা নেয়ার কথা জানান অঞ্চলিক উপপরিচালক আরও বলেন, এবার রাজশাহী অঞ্চলে ২৮ শতাংশ সরিষার আবাদ বাড়ানো হবে। আগামী বছর তা ৯৮ শতাংশে পৌঁছাবে। ২০২৪ সালে ১৬০ শতাংশ জমিতে সরিষার আবাদ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।

পরিবল্পনা বাস্তবায়নে কৃষকদের তেলফসল চাষে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। প্রণোদনাও দেয়া হচ্ছে। উদ্যোগী বীজ বিক্রেতাদের মাধ্যমে বীজ পাচ্ছেন কৃষক। এছাড়া উপজেলা পরিষদের তহবিল থেকেও বীজ বিতরণ হচ্ছে।

ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকও সরিষা চাষে বেশ আগ্রহী। কৃষক আমন ধান তুলে নেয়ার পর কিছু জমি পতিত রাখেন। আমরা সেই জমিতে সরিষা চাষের পরামর্শ দিচ্ছি। যেনো কৃষক নিজেদের প্রয়োজনীয় তেলের যোগান নিজেরাই নিশ্চিত করতে পারবেন।

এবার আবহাওয়া সরিষা চাষের বেশ উপযোগী জানিয়েছে  যে সমস্ত জমিতে আমন ধান কাটা হচ্ছে, সাথে সাথেই সেখানে সরিষা বপনের পরামর্শ দেন আঞ্চলিক অতিরিক্ত পরিচালক। একই সাথে কৃষকদের ফলন ও তেলের উৎপাদন বাড়াতে উচ্চফলনশীল জাতের সরিষা চাষের পরামর্শ দেন।

 

Leave a Reply