রাজাকার পুত্রকে সভাপতি বানাতে এমপি শিমুলের সুপারিশ

স্টাফ রিপোর্টার: চাঁপাইনবাবগঞ্জ -১ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুলের বিরুদ্ধে রাজাকার পূত্রকে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি পদে সুপারিশ করার অভিযোগ উঠেছে। এনিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরোধের মুখেও পড়েন সরকার দলীয় এই সংসদ সদস্য।

জানা গেছে, সম্প্রতি শাহাবাজপুর ইউ সি উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি গঠন হয়েছে। এতে সভাপতি দেখানো হয়েছে শাহাবাজপুর ইউনিয়নের নামোচাকপাড়ার বাসিন্দা নজমুল হককে।

এলাকাবাসী বলছেন, নজমুল হক এলাকার একটি মাদ্রাসার সুপার। তিনি জামায়াতের রাজনীতিতে সক্রিয়। তার বাবা ইনসান আলী এলাকার চিহ্নিত রাজাকার ছিলেন। তার এক ভাই বিএনপি-জামায়াতের চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেন।

তবে নজমুল হককে স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুলের সুপারিশের প্রেক্ষিতে সভাপতি বাবানোর দাবি করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এমপির সুপারিশসহ নথিপত্র অনুমোদনের জন্য এরই মধ্যে রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডে পাঠিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এনিয়ে রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন আজমতপুর মোল্লাটোলার বাসিন্দা ও শাহাবাজপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সহসভাপতি মো. নাসিম। নজমুল হকের আগে যুবলীগ নেতা নাসিম কে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি বানাতে ডিও লেটার দিয়েছিলেন এমপি।

যুবলীগ নেতা মো. নাসিমের অভিযোগ, এমপির ডিও অমান্য করে প্রধান শিক্ষক নজমুল হককে সভাপতি বানাতে কাগজপত্র শিক্ষা বোর্ডে পাঠিয়েছেন। এর আগেও এই জামায়াত নেতা সভাপতি ছিলেন। সেই সময় বেশ কিছু শিক্ষক নিয়োগ হয়।

প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগসাজসে সেই অর্থ লোপাট করেছেন সভাপতি নজমুল হক।
তার অভিযোগ, সামনে আরও কিছু কর্মচারী নিয়োগ আছে। এই নিয়োগেও বাণিজ্য করতে চান প্রধান শিক্ষক ও জামায়াত নেতা নজমুল। এ জন্যই পছন্দমত সভাপতি বানানোর চেষ্টা করছেন প্রধান শিক্ষক।

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত রাজাকার তালিকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার যে ১৫ জনের নাম এসেছে তাতে ১৪ নম্বরে রয়েছে ইহসান আলী। এই ইহসান আলীই সভাপতি পদে আলোচনায় আসা নজমুল হকের বাবা।

এই তথ্য জানিয়েছেন শাহাবাজপুর ইউনিয়নের নলডুবুরী এলাকার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবজাল হোসেন বজলু । তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন ইনসান আলী মুসলিমলীগ করতেন। পরে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের সিলেকশন চেয়ারম্যানও হন।

অভিযোগ উঠেছে, শাহাবাজপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খাদেমুল ইসলাম রাজাকারপুত্র নজমুল হককে এমপির কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনিই সভাপতি পদে নজমুল হককে এমপির ডিও এনে দেন। নিয়োগ বাণিজ্য করতেই ওই আওয়ামী লীগ নেতা এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা।

তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন খাদেমুল ইসলাম। তিনি জানান, ২০০৩ সাল থেকে তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ২০১০ সালে নজমুল হকের ভাই মতিউর রহমান মতিন ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। মূলত মতিউর রহমানের অনুরোধে নজমুল হককে তিনি এমপির কাছে নিয়ে যান। তাদের বাবা রাজাকার ছিলেন এটি তিনি জানতেন না বলে দাবি করেন।

শাহাবাজপুর ইউ সি উচ্চ বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক পদে কর্মরত মতিউর রহমান মতিন। তিনি স্বীকার করেন, তার বাবা মুক্তিযুদ্ধের আগে মুসলিম লীগ করতেন। তবে তিনি রাজাকার ছিলেননা। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বপালন করেন।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওসমান গনি বলেন, তারা বিধি মেনেই পরিচালনা কমিটি গঠনের দিকে এগুচ্ছিলেন। এর মাঝে এমপি নজমুল হককে সুপারিশ করেন।

কমিটি অনুমোদনের জন্য তারা শিক্ষাবোর্ডে জমা দেয়ার পর অভিযোগ উঠে। বিষয়টি শিক্ষাবোর্ড তদন্ত করছে। নিয়োগে আগে কোনো বাণিজ্য হয়নি দাবি করে আগামী নিয়োগেও বাণিজ্যের সুযোগ নেই বলে জানান প্রধান শিক্ষক।

এদিকে, রাজাকারপুত্রকে সভাপতি পদে সুপারিশের বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল বলেন, নজমুল হককে তিনি চেনেননা। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক খাদেমুলের সুপারিশের প্রেক্ষিতে তাকে তিনি সভাপতি পদে সুপারিশ করেন।

পরে বিষয়টি জানাজানি হলে তিনি আওয়ামী লীগ নেতা মো. নাসিমকে সভাপতি করতে সুপারিশ করেন। রাজাকারপুত্রের সভাপতি হবার সুযোগ নেই বলেও জানান এমপি।

জানতে চাইলে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক জিয়াউল হক জানান, আমাদের কাছে এলাকাবাসীর তরফ থেকে বিধি অনুযায়ী পরিচালনা কমিটির নির্বাচন হয়নি-এমন অভিযোগ ছিল।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে দিয়ে বিষয়টির তদন্ত করা হয়েছে। তিনি প্রতিবেদনও জমা দিয়েছেন। ওই প্রতিবেদনের আলোকে শিগগরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Leave a Reply