পাকা আমে মাছি পোকা, বেকায়দায় চাষি

32
পাকা আমে মাছি পোকা, বেকায়দায় চাষি

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী অঞ্চলের আম বাগানে থোকায় থোকায় ঝুলছে পরিপক্ক আম্রপালি, ফজলি ও আশি^না জাতের আম। ভালো দামের আশায় অনেক চাষি বাগানে এখনো রেখেছেন হিমসাগর ও ল্যাংড়া।

ঈদের ছুটি শেষে ধীরে ধীরে জমে উঠছে আম বাজারগুলো। তিন বছরের টানা লোকসান কাটিয়ে এবার লাভের আশা দেখছেন চাষিরা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাগানে মাছি পোকার হানায় সেই আশায় গুড়েবালি।

আম চাষিরা বলছেন, মাছি পোকার বেশি আক্রমন হচ্ছে হিমসাগর ও ল্যাংড়ায়। গত ২৮ মে হিমসাগর এবং ৬ জুন থেকে ল্যাংড়া আম নামানো শুরু হয়েছে গাছ থেকে। ফলে এই দুই জাতের আমে মাছি পোকা দমনে কীটনাশক প্রয়োগের উপায় নেই।

পাকা আমে মাছি পোকা, বেকায়দায় চাষি

এলাকাভেদে এই পোকার আক্রমন কম-বেশী হচ্ছে। অনেকেই লাভের আশা বাদ দিয়ে আম নামিয়ে বাজারে তুলছেন। কিন্তু আম্রপালি, ফজলি ও আশি^না আম নামানোর সুযোগ নেই। প্রশাসনের বেধে দেয়া সময়সীমা অনুযায়ী, আগামী ১৬ জুন আম্রপালি ও ফজলি এবং ১ জুলাই আশ্বিনা আম বাজারে উঠবে।

হাতে সময় না থাকায় কীটনাশক প্রয়োগ নিয়েও বেকায়দায় চাষি। কোথাও কোথাও কীটনাশক বিক্রেতাদের পরামর্শে চাষিরা বাগানে কীটনাশক প্রয়োগ করছেন। এতে বিষক্রিয়া আমে থেকে যাবার শঙ্কা বাড়ছে।

নওগাঁর পোরশা উপজেলার বড়রনাইল এলাকার স্কুল শিক্ষক নাজমুল হোসাইন। ল্যাংড়া, আম্রপালি, ফজলি ও আশি^না মিলে তার আম বাগান রয়েছে ৮ বিঘা। তিনি বলছিলেন, এখন পুরো বাগানেই দেখা দিয়েছে মাছি পোকা। তিনি এই পোকা দমনে হিমশিম খাচ্ছেন।

পাকা আমে মাছি পোকা, বেকায়দায় চাষি

কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে তিনি আম রক্ষার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এলাকার অনেকে আম চাষি কীটনাশক বিক্রেতাদের পরামর্শে কীটনাশক প্রয়োগ করছেন বাগানে। কিন্তু কিছুতেই কাজেরকাজ হচ্ছেনা। পুরো বরেন্দ্র এলাকার আমবাগানজুড়ে মাছি পোকার ব্যাপক আক্রমন হচ্ছে বলে জানান এই বাণিজ্যিক আম চাষি।

পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কমিউনিটি ভিত্তিক বাগান ব্যবস্থাপনায় জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (রাবি)। জৈব বালাইনাশক ভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আমের ক্ষতিকর পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা নিয়ে গত বছর থেকে মাঠ চাষি পর্যায়ে গবেষণা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বারির কীটতত্ত্ব বিভাগ।

আমের রাজধানী খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীতে চলমান এই গবেষণাকাজে সার্বিক সহায়তা দিচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ লাক্ষা গবেষণা কেন্দ্র। এই কাজের সমন্বয়কের দায়িত্বপালন করছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ লাক্ষা গবেষণা কেন্দ্রের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জগদীশ চন্দ্র বর্মন।

পাকা আমে মাছি পোকা, বেকায়দায় চাষি

তিনি বলেন, গত বছর থেকে চাষি পর্যায়ে এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা কাজ চলছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের বামনডাঙা ও শেয়ালা এলাকায়। একই ধরণের গবেষণা কাজ চলছে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার উত্তর মনিগ্রাম ও বলিহার এবং চারঘাটের হরিদাগাছি এলাকায়। বারি উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি নিয়ে তিন বছর গবেষণা শেষে তা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা নেয়া হবে।

মুলত: আকর্ষন ও মেরে ফেলা, সেক্স ফেরোমন ফাঁদ এবং সয়েল রিচার্জ এর সমন্বয় এই প্রযুক্তি। জৈব বালাইনাশক ভিত্তিক এই প্রযুক্তিতে আমের ক্ষতিকর মাছি পোকা দমন শতভাগ কার্যকর। তবে এ ক্ষেত্রে কমিউনিটি ভিত্তিক বালাই ব্যবস্থাপনা জরুরী।

সমন্বিত এই প্রযুক্তি প্রসঙ্গে ড. জগদীশ চন্দ্র বর্মন, আম পাকার ৪০ দিন মাছি পোকার আক্রমন হয়। এপ্রিলের শুরু থেকে মাঝামাঝিতে আম গাছের গোড়ায় ছত্রাক জীবানু মিশ্রিত ট্রাইকোডার্মা সার প্রয়োগ করতে হবে। একে বলা হচ্ছে সয়েল রিজার্চ। এতে মাটিতে অবস্থানকারী মাছি পোকার পুত্তলিগুলো নষ্ট হয়ে যাবে।

একই সাথে পুরুষ ও মাছি পোকা আর্কষনে আম গাছের গোড়ায় এবং গাছের ডালে লঘুমাত্রায় আলফা সাইফারমেথ্র্রিন মিশ্রত আলাদা বিশেষ পেস্ট দিয়ে ফাঁদ পাততে হবে। মাছি পোকা আকৃষ্ট হয়ে এখানে এলেই মারা পড়বে।

পাকা আমে মাছি পোকা, বেকায়দায় চাষি

মিথাইল ইউজেনল ফেরোমন ব্যবহার একই সময় পাততে হবে আলাদা সেক্স ফেরোমন ফাঁদ। বোয়ামে পাতা এই ফাঁদেও প্রচুর পুরুষ পোকা মারা যাবে। এতে বাগানে মাছি পোকার আক্রমণ কমে যাবে অনেকাংশে। তবে সুফল পেতে পুরো এলাকাজুড়েই চাষিদের এই প্রযুক্তির প্রয়োগ করতে হবে।

বাঘা উপজেলার উত্তর মনিগ্রাম এলাকার শহিদুল ইসলামের দেড় বিঘা বাগানে এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে। শহিদুল ইসলাম বলেন, দ্বিতীয় বছরেরমত এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। প্রথম বছরই আড়াই লাখ টাকার আম বিক্রি করেছিলেন। এবার আম বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ টাকার। এলাকার অনেক আম বাগান মালিক এই প্রযুক্তিতে আগ্রহী হয়েছেন।

বিশেষ এই গবেষণা কাজ চলছে বাংলাদেশে শাক-সবজি, ফল ও পান ফসলের পোকামাকড় ব্যবস্থাপনায় জৈব বালাইনাশক ভিত্তিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও সংম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায়।

এই প্রযুক্তি প্রসঙ্গে প্রকল্পটির পরিচালক ও বারির কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. দেবাশীষ সরকার বলেন, কৃষকরা না জেনে ইচ্ছেমত আম বাগানে কীটনাশক-হরমোন প্রয়োগ করেন। এতে যেমন বাগানের ক্ষতি হয়, তেমনি বিষক্রিয়া রয়ে যাবার শঙ্কা থেকে যায় আমে।

এ ক্ষেত্রে মুক্তি মিলতে পারে জৈব রোগবালাই ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনায়। দিন দিন জৈব রোগবালাই ও পোকামাড়ক ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি জনপ্রিয় হচ্ছে। বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় বিষমুক্ত আম উৎপাদনে ঝুকছেন চাষিরা। বিষমুক্ত আম রপ্তানী হচ্ছে বিভিন্ন দেশে।

পাকা আমে মাছি পোকা, বেকায়দায় চাষি

তিনি যোগ করেন, অনেকেই মাছি পোকা দমনে ফ্রুটব্যাগিং প্রযুক্তির কথা বলছেন, কিন্তু এটি ব্যয়বহুল। চাষি পর্যায়ে এটি সহজলভ্য করাও বেশ কঠিন। সাশ্রয়ি এবং অধিক কার্যকর জৈব রোগবালাই ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনায় জোর দিচ্ছে বারি।

আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসেবে, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ এবং নাটোর জেলায় সর্বশেষ গত ২০১৭-২০১৮ কৃষি বর্ষে ৭০ হাজার ৩৪৬ হেক্টর জমিতে আমবাগান ছিল। তা থেকে আম উৎপাদন হয় ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৩৬১ মেট্রিক টন। এটিই এ বছরের লক্ষ্যমাত্রা।

এর আগে ২০১১-২০১২ কৃষি বর্ষে রাজশাহী অঞ্চলে ৪২ হাজার ৪১৭ হেক্টর জমিতে আমবাগান ছিল। সেইবার আম উৎপাদন হয় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৭৩ মেট্রিক টন। এছাড়া ২০১৪-২০১৫ কৃষি বর্ষে ৫৪ হাজার ৭২২ হেক্টর জমিতে আম উৎপাদন হয় ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৯৩৬ মেট্রিক টন।

আরও পড়ুন

কৃষকের মুখে হাসি ফোটালো ‘ব্ল্যাকবেবি’, ‘মধুমালা’

লিচুর ফল ছিদ্রকারী পোকা নিয়ন্ত্রনে সফলতা

ঝড়পড়া আম থেকে হরেক স্বাদের আচার

রাজশাহীর আম বাণিজ্য শুরু

আপনার মন্তব্য