রামেক হাসপাতালে ট্রলি ছুঁলেই গুনতে হয় টাকা

101
রামেক হাসপাতালে ট্রলি ছুঁলেই গুনতে হয় টাকা

স্টাফ রিপোর্টার: মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে। কিন্তু রোগী ওঠালেই গুনতে হচ্ছে মোটা অংকের ভাড়া। হাসপাতালের অস্থায়ী কর্মীরা প্রকাশ্যেই এই ভাড়া আদায় করছেন।

রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, সেবার নামে অস্থায়ী কর্মীরা রোগীদের জিম্মি করছেন। এনিয়ে প্রায়ই ঘটছে অপ্রীতিকর ঘটনা। অথচ জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এতে ক্ষোভ বাড়ছে জনমনে।

রামেক হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, রোগী বহনে হাসপাতালে রয়েছে ৭০টি ট্রলি। তবে এসব ট্রলি ছুঁতে পারেন না রোগী ও তাদের স্বজনরা। প্রত্যেক ট্রলির অপারেটর বনে গেছেন হাসপাতালে নিয়োজিত অস্থায়ী কর্মীরা। ২৪ ঘণ্টায় তিন শিফটে ১৮০ জন অস্থায়ী কর্মী দায়িত্বপালন করেন হাসপাতালে। রুটিনকাজ বাদ দিয়ে এরা পুরো সময় ব্যস্ত থাকেন ট্রলি টানতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতাল সংলগ্ন সেপাইপাড়া এলাকার বাসিন্দা জানে আলম জনি অস্থায়ী জনবল সরবরাহ করেছেন হাসপাতালে। এদের অধিকাংশই তার এলাকার লোকজন। হাসপাতালের সামনের চেম্বারে বসেই এদের নিয়ন্ত্রণ করেন জনি।

স্থানীয় হওয়ায় ট্রলিগুলো থাকে এসব কর্মীর হাতেই। বিনামূল্যের ট্রলিতে রোগী ওঠলেই এরা চেয়ে বসেন ভাড়া। রোগী প্রতি ৫০ থেকে ২০০ টাকা আদায় করেন এরা। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই জড়িয়ে পড়েন বিবাদে। এনিয়ে প্রায়ই ছোটখাটো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে হাসপাতালজুড়ে।

কয়েকজন অস্থায়ী কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হাসপাতালে তেমন কাজ না থাকায় ট্রলি নিয়ে রোগী বহন করতে হয় তাদের। তবে এনিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের কাছ থেকে ভাড়া নেয়ার সুযোগ নেই।

কেউ কেউ নিজেদের এই কর্মকাণ্ড অনৈতিক বললেও কেউ কেউ বলছেন, এছাড়া তাদের উপায়ও নেই। তাদের ভাষ্য, মাসে তাদের তিন হাজার টাকা চুক্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু পান এক থেকে দেড় হাজার টাকা। তাও দেয়া হয় অনিয়মিত। জীবন বাঁচাতে তাই বাধ্য হয়ে রোগীদের কাছে হাত পাততে হয় ‘ট্রলি অপারেটরদের’।

রামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ভাড়াকরা মাইক্রোবাসে রোগীর মরদেহ তুলছিলেন নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার নিমদীঘি গ্রামের শাহরিয়ার ইমন সোহেল। মরদেহ তোলার পর ট্রলি অপারেটর তার কাছে চেয়ে বসেন ‘বখসিস’। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন সোহেল।

তার ভাষ্য, বুক-পেটে ব্যাথা নিয়ে দুদিন আগে তার নানা শামশুল হুদা ভর্তি হয়েছিলেন হাসপাতালের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে হৃদরোগ বিভাগে রোগী নেয়ার পর ট্রলি অপারেটরকে ৫০ টাকা দিতে হয়েছে। সেখান থেকে পরে রোগীকে হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেন চিকিৎসক। রোগীকে সেখানে নিতেও ৫০ টাকা দিকে হয়েছে ট্রলি অপারেটরকে।

মাঝে কয়েকবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীকে হাসপাতালের বাইরেও নিতে হয়। প্রতিবার ১০০ টাকা করে নিয়েছেন ট্রলি অপারেটর। অপারেশন থিয়েটার, এমনকি হাসপাতাল থেকে মরদেহ বের করতেও ট্রলি ভাড়া দিতে হয়েছে।

কেবল সোহেলই নন, এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা হাসপাতালে আসা প্রত্যেক রোগী ও তাদের স্বজনদের। তবে কেউ কেউ এর প্রতিবাদ করলেও একজোট হয়ে ট্রলি অপারেটররা এগিয়ে আসেন। শেষে দাবিকৃত অর্থ দিয়েই হাসপাতাল ছাড়তে হয় রোগী ও তাদের স্বজনদের।

রামেক হাসপাতালে চিকিৎসার নামে এই অব্যবস্থাপনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাজশাহীর সামাজিক সংগঠন রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই নানান অব্যবস্থাপনা চলে আসছে হাসপাতালে। অভিযোগ করেও প্রতিকার মিলছে না। হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়নে এসব অব্যবস্থাপনা দূর করার দাবি জানান তিনি।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে কয়েক দফা যোগাযোগ করে রামেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিলুর রহমানকে পাওয়া যায়নি। কয়েক দফা চেষ্টা করেও মুঠোফোনে তার মন্তব্য মেলেনি।

তবে হাসপাতাল কর্মীদের রোগী জিম্মি করে ট্রলি ভাড়া নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এনামুল হক। কিন্তু এনিয়ে তাদের কিছুই করার নেই বলে জানান ডা. এনামুল।

প্রসঙ্গত, ৫৭ ওয়ার্ডে রামেক হাসপাতালে শয্যা রয়েছে ১২০০। কিন্তু প্রতিদিন হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নেন দুই থেকে আড়াই হাজার রোগী। সবচেয়ে বড় চিকিৎসা কেন্দ্র হওয়ায় পুরো অঞ্চলের রোগীরা ভিড় জমান রামেক হাসপাতালে। রোগীদের জিম্মি করে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে হাসপাতাল কেন্দ্রিক নানান বাণিজ্য।

আপনার মন্তব্য