ছাত্রলীগের ধাওয়া খেয়ে ক্যাম্পাস ছাড়া ছাত্রদল!

17

আজহার উদ্দিন শিমুল, এমসি কলেজ: আড়াই বছর আগে সেই যে ছাত্রলীগের ধাওয়া খেয়েছিলো এরপর থেকে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের দেখা মেলেনি। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজে এখণ ছাত্রলীগের একক আধিপত্য। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কোনো অবস্থান নেই। অভিযোগ আছে ‘সহাবস্থান’ না থাকার কারণে কলেজ ছাত্রদল কমিটির কোনো নেতা-কর্মী কলেজে দীর্ঘদিন ধরে যেতে পারছেন না।

২০১৭ সালের আগে দীর্ঘদিন কমিটি ছাড়া ছিলো এমসি কলেজ ছাত্রদল। এক যুগ পরে ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ছাত্রদলের একটি আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয় এমসি কলেজে। সেই কমিটির আহবায়ক হিসেবে বদরুল আজাদ রানা, সদস্য সচিব মো. দেলোয়ার হোসাইন ও একমাত্র সদস্য হিসেবে রুবেল ইসলাম স্থান পান। দীর্ঘদিন ‘ছন্নছাড়া’ ও দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে একটা দূরত্বও তৈরী হয়ে গিয়েছিলো। সেই দূরত্ব ও নিজেদের অবস্থান জানান দিতে নতুন কমিটি গঠন উপলক্ষে আনন্দর‌্যালীর আয়োজন করে এমসি কলেজের নবগঠিত ছাত্রদল।

২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি সোমবার আনন্দর‌্যালী নিয়ে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে বের হলে সেই কমিটিকে দাঁড়াতেই দেয়নি ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ছাত্রদলের ব্যানার কেড়ে নিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে উল্লাস করেন। পরে প্রকাশ্যে দা, হকিস্টিক, রড উঁচিয়ে ধাওয়া করে ক্যাম্পাস ছাড়া করেন তাদের। ধাওয়ায় ছাত্রদলের তিন কর্মী আহত হওয়ার খবরও গণমাধ্যমে আসে।

মূলত তখনই ছাত্রলীগের দৌঁড়ানি খেয়ে ক্যাম্পাস ছাড়া হয় ছাত্রদল। এরপর প্রায় আড়াই বছর কেটে গেলেও এখন পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ছাত্রদলকে দেখা যায় নি। সম্প্রতি এমসি কলেজ প্রশাসন গৌরবের ১২৭ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান পালন করে। সেই অনুষ্ঠানেও ছাত্রলীগ ছাড়া ‘মূলধারার’ কোনো ছাত্র সংগঠনকে দেখা যায় নি। তবে ছাত্রফ্রন্টের ‘কিছু সংখ্যক’ নেতাকর্মী অনুষ্ঠান স্থলে ছিলেন।

এমসি কলেজ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে ২০১৪ সালের ৭ মার্চ ছাত্রলীগের সমাবেশের সমালোচনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটুক্তি করেছিল। সেই থেকে ছাত্রলীগ এমসি কলেজে ছাত্রদলকে ‘নিষিদ্ধ’ করে।
ছাত্রদলকে ধাওয়ার সময় পুলিশের নিরব ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ছিলো! অভিযোগ আছে ২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি কলেজ ক্যাম্পাস ও টিলাগড় মোড়ে অবস্থানরত পুলিশের সামনেই ছাত্রলীগ প্রকাশ্যে দা, রড নিয়ে অবস্থান করলেও পুলিশ কোনো বাঁধা দেয়নি।

ছাত্রদলকে ধাওয়ার পরেই এ ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়। সিলেটের তৎকালীন মূখ্য মহানগর বিচারিক হাকিম মো. সাইফুজ্জামান হিরো ফৌজধারী কার্যবিধির ক্ষমতাবলে এক আদেশে ধাওয়াকারীদের চিহ্নিত করে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে মহানগর পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আদেশে বলা হয়েছিলো, ‘সিলেট এমসি কলেজ দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী চক্রের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে, যা বারবার জাতীয় পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে। এই ঘটনা জনশৃঙ্খলা ও আইনের শাসনের প্রতি চরম হুমকি স্বরূপ। পত্রিকায় প্রকাশিত ওই সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের জন্য কারা, কীভাবে দায়ী, তা শনাক্ত করে ঘটনা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’ এ বিষয়ে তদন্ত করে পুলিশ কমিশনারকে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেছিলেন আদালত।
আদালত সূত্রে জানা যায়, দুই দফা সময় নিয়ে ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দেয় পুলিশ। একই বছরের ১৫ ফেব্রæয়ারি আদালত তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ‘দা উঁচিয়ে ধাওয়াকারী’ হিসেবে চিহ্নিত ছয়জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার আইনে মামলা রেকর্ডভুক্ত করার আদেশ দেন।

প্রায় ১ মাস পরে ১৯ মার্চ আদালতে পাঁচজন আত্মসমর্পণ করেন। আপন নামের একজন আত্মগোপনে ছিলেন। পাঁচজন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন প্রার্থনা করেছিলেন। জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। কারাগারে যাওয়া পাঁচজন তারেক আহমদ (২৩), সালমান অপু ওরফে শামসুল ইসলাম অপু (২৪), আলতাফ হোসাইন মুরাদ (২৩), রবিউল হাসান (২২) ও সৌরভ আচার্য (২৬) বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি ভোগ করেন।

এমসি কলেজ ছাত্রদলের আহবায়ক কমিটির সদস্য সচিব মো. দেলওয়ার হোসাইন একাত্তর কথার সাথে কথা বলেন, ক্যাম্পাসের সার্বিক পরিস্থিতি ও নিজেদের পরবর্তী ভাবনা নিয়ে। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘মূলত ক্যাম্পাসে ‘সহাবস্থান’ না থাকার কারণেই আমরা কলেজে যেতে পারছি না। ছাত্রলীগ আমাদেরকে বারবার বাঁধা দিচ্ছে। ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ফিরে এলে আমরা পুনরায় ক্যাম্পাসে নিয়মিত গিয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কাজ করে যাবো।’

‘সহাবস্থানের’ ব্যাপারে সদস্য সচিবের এমন অভিযোগ উড়িয়ে দেন এমসি কলেজ ছাত্রলীগ সংগঠক হোসাইন আহমেদ। তিনি উল্টো দাবি করেন ঐ ঘটনার পরে তিনি একাধিকবার ছাত্রদলের নেতাদের ক্যাম্পাসে আসার ‘আমন্ত্রণ’ জানান!

সিলেট জেলা ছাত্রদল নেতা ও এমসি কলেজ ছাত্রদলের আহবায়ক বদরুল আজাদ রানা একাত্তরের কথাকে বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আমলে ক্যাম্পাসে দেশের কোন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নেই। পুরো দেশ অশান্তিতে নিমজ্জিত। ছাত্রলীগ দেশের প্রতিটি ক্যাম্পাসেই হিংসা ও অস্থিরতার রাজনীতি কায়েম করেছে, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের কারণে মানুষ আজ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। তারা প্রকাশ্যে গণমাধ্যমকর্মীদের উপর পর্যন্ত হামলা করছে। মামলা হামলায় বিপর্যন্ত ছাত্রদল নেতাকর্মী বাসা-বাড়িতেই নিরাপদে থাকতে পারছেন না।’

আপনার মন্তব্য