গণপূর্তের শতকোটি টাকার জমি আওয়ামী লীগ নেতার কব্জায়

285

দেশজুড়ে ডেস্ক: বরিশাল শহরের গণপূর্তের শতকোটি টাকার জমি আওয়ামী লীগ নেতার কব্জায়।

শহরের উপকণ্ঠে তালতলী বাজার এলাকায় গণপূর্ত বিভাগের ৯ একরের বেশি জমি নামে-বেনামে দখলে নিয়েছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহাতাব হোসেন সুরুজ।

গণপূর্তের চোখের সামনে কয়েক বছর ধরে এ জমি দখলে নেন সুরুজ। তবে তিনি দখল করার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। 

কিন্তু গত বুধবার গণপূর্ত বিভাগ দখলদারদের যে তালিকা জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেছে, সেখানে সুরুজ এবং তাঁর ভাইসহ আওয়ামী লীগের অন্তত ১৫ নেতার নাম রয়েছে; যদিও তাদের মধ্যে বেশির ভাগই ভাড়াটিয়া।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণপূর্ত বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের জমিতে বালু ভরাট করে গরুর হাট ও অস্থায়ী বাজার বসানো, তিনটি পুকুর দখল করে মাছ চাষ, অস্থায়ী দুই শতাধিক দোকান তুলে ব্যবসা পরিচালনা—এর সব কিছুই নির্বাহী প্রকৌশলী জানতেন।

 স্থায়ী স্থাপনা ও মাছ বাজার করার সময়ও নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবহিত করা হয়েছিল; কিন্তু তিনি নীরব ছিলেন। পরে জানতে পেরেছি তাঁকে ম্যানেজ করেই সব কিছু হচ্ছে।’

এ কর্মকর্তা বলেন, তালতলী বাজার এলাকায় বর্তমানে প্রতি শতাংশ জমি ১১-১২ লাখ টাকায় বেচাকেনা হয়। সেই হিসাবে গণপূর্তের বেদখল হয়ে যাওয়া জমির দাম ১০০ কোটি টাকার বেশি।

জানতে চাইলে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অলিবার গুদা বলেন, ‘আমরা দখলের বিষয়ে অনেক আগে থেকেই মন্ত্রণালয়ে অবহিত করেছি। তারা আমাদের ওই দখলদারদের উচ্ছেদে কোনো নির্দেশনা দেয়নি।’ 

তিনি জানান, দখল হয়ে যাওয়া জমির সীমানা নির্ধারণে গণপূর্ত বিভাগ গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে লোক পাঠিয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় লোকজন বাধা দেওয়ায় তা হয়নি। এখন জেলা প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ের সহায়তা না পেলে ওই সম্পত্তি দখলমুক্ত করা সম্ভব নয়।

জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান বলেন, ‘গণপূর্ত বিভাগ তাদের জমি বেদখলের বিষয়ে আমাদের আদৌ অবহিত করেনি। 

যদি অবহিত করত তবে আমরা অবশ্যই উচ্ছেদের ব্যবস্থা নিতাম। তা ছাড়া তারা সদর উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) অবহিত করলে আমরা উচ্ছেদের ব্যবস্থা করতাম। কিন্তু তারা কোনোটিই করেনি।’

 তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি বেদখল জমি উচ্ছেদের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে প্রথমে জেলা প্রশাসনকে উচ্ছেদের জন্য চিঠি দিতে হবে। এরপর জেলা প্রশাসন উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু গণপূর্ত বিভাগের পক্ষ থেকে এ রকম কোনো চিঠি আমাদের দেওয়া হয়নি। নির্বাহী প্রকৌশলী ভুল বলছেন।’

গত বুধবার তালতলী বাজারে গিয়ে জানা যায়, সদর উপজেলার চরবাড়িয়া মৌজার ৪১ নম্বর জেএলের ৩ নম্বর খতিয়ানের (দাগ নম্বর ১৭৭, ১৭৮, ১৮১, ২৪৪, ২৪৫ ও ২৪৬) গণপূর্ত বিভাগের ৯ একর ১৫ শতাংশ জমিই বেদখল হয়ে গেছে। আগের জরিপে গণপূর্ত বিভাগের নামে পুরো জমিটিই রেকর্ড হয়েছিল। কিন্তু নতুন জরিপে এক একর ১ শতাংশ জমি বেহাত হয়ে গেছে।

চরবাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জসীম উদ্দিন বলেন, ‘বিএস ৩ নম্বর খতিয়ানে আট একর ১৪ শতাংশ জমি রেকর্ড রয়েছে গণপূর্তের নামে। বাকি জমির কী হয়েছে, তা শুধু তারাই জানে। এ বিষয়ে আমাদের কাছে জানতে চাইলে আমরা তাদের রেকর্ড অনুসারে বলতে পারব।’

জানা গেছে, গণপূর্তের এ ৯ একর ১৫ শতাংশ জমিই নামে-বেনামে চরবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মাহাতাব হোসেন সুরুজের দখলে রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ একরই সরাসরি তার দখলে আছে। সেখানে তিনি মাছ বাজার, মার্কেট ও বালুর খলা করে ভাড়া দিয়েছেন এবং নিজেও ব্যবসা করছেন। 

বাজার লাগোয়া তিন একর জমির ওপর বিশাল একটি পুকুর ছিল, যার দুই একরই ভরাট করে ফেলা হয়েছে। ভরাট করা জমির চারপাশে ৩০০-এর বেশি দোকান রয়েছে। 

এগুলোও ইউপি চেয়ারম্যান সুরুজ, তাঁর স্বজন ও অনুসারীদের দখলে। এরপর তালতলী ওভারব্রিজের নিচের পুরনো রাস্তার দুই পাশে দুই একর জমির ওপর শতাধিক দোকান তোলা হয়েছে। 

ওই সব দোকানের পেছনে অন্তত ১০টি বালুর খলা রয়েছে, যার সবই ভাড়া দেওয়া। চেয়ারম্যানের ভাই ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি গোলাম কবিরের দখলে রয়েছে প্রায় দুই একর জমি। 

যেখানে তিনি দোকান তৈরি করে ভাড়া দিয়েছেন এবং তিনটি বালুর খলা করে নিজে একটি চালাচ্ছেন ও অন্য দুটি ভাড়া দিয়েছেন। এ ছাড়া গণপূর্তের তিনটি পুকুরের আড়াই একর সম্পত্তি ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য ফিরোজ গাজীর দখলে। যদিও তার দাবি, এগুলো তিনি ইজারা নিয়েছেন।

জানা যায়, চরবাড়িয়া ইউনিয়নের তালতলী বাজারটি প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। ওই বাজারের ৫০০ ব্যবসায়ীর জন্য প্রায় দুই যুগ আগে দুটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করে দেয় জেলা পরিষদ। 

গণপূর্ত বিভাগের জমিতে টয়লেট দুটি করা হলেও তখন তারা বাধা দেয়নি। মাস তিনেক আগে টয়লেট দুটি ভেঙে দেন ইউপি চেয়ারম্যান সুরুজ। এরপর আশপাশের প্রায় এক একর জমির ওপর চারতলা মার্কেট ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করেন

। এরই মধ্যে একতলার কাজ শেষ হয়েছে। রাস্তার পাশের পাঁচটি দোকান ভাড়াও দেওয়া হয়েছে। বছরখানেক আগে বাজার লাগোয়া (তালতলী সেতুর পাশে) গণপূর্ত বিভাগের এক একর জমি ভরাট করেন সুরুজ। 

এরপর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) কাছ থেকে সাড়ে আট লাখ টাকা বরাদ্দ এনে সেখানে একটি মাছ বাজার বানানোর কাজ শুরু করেন। এ নিয়ে কালের কণ্ঠে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। এরপর কাজ বন্ধ রাখা হয় ছয় মাস। 

কিন্তু পরে দুই বিভাগকেই ম্যানেজ করে দুই মাস আগে কাজটি শেষ করা হয়। বাজারের প্রায় ৫০টি দোকান থেকে তিনি ভাড়া তোলেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তালতলী বাজারের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, সব জমিই তাদের (চেয়ারম্যান ও তার স্বজন) দখলে। গণপূর্ত বিভাগ ভাড়াটিয়াদেরও দখলদার হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এ কারণে তাদের তালিকায় দখলদারের সংখ্যা ৫২।

ওই ব্যবসায়ীরা বলছেন, গণপূর্ত বিভাগ সরেজমিনে এলে ভাড়াটিয়াদের দখলদার হিসেবে দেখানো হয়। চেয়ারম্যানের কাছ থেকেই গণপূর্ত বিভাগ তালিকা নেয়।

জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইউপি চেয়ারম্যান মাহাতাব হোসেন সুরুজ বলেন, ‘গণপূর্ত বিভাগের জমি খালিই পড়ে ছিল। আমার কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর বাইরে কিছু নেই।’

আপনার মন্তব্য