ছাত্রনেতাদের এভাবে চলে যাওয়া দুঃখজনক

40

জাতীয় ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন,  ছাত্রনেতাদের যেখানে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নেওয়ার কথা, সেখানে তারাই একে একে বিদায় নিচ্ছে। আমার হাতে গড়া ছাত্রনেতাদের এভাবে বিদায় নেওয়াটা দুঃখজনক।

রোববার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য সদ্য প্রয়াত আবদুল মান্নানের মৃত্যুতে আনীতে শোক প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। 

আবদুল মান্নানের অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন সংসদ নেতা।

 স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ওই আলোচনায় আরো অংশ নেন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, বেগম মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর, শাজাহান খান প্রমুখ।

আলোচনা শেষে শোক প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। পরে প্রয়াত সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের রুহের মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। 

এরপর চলতি সংসদের সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে রেওয়াজ অনুযায়ী সংসদ অধিবেশনের সকল কার্যক্রম স্থগিত রেখে সোমবার বিকাল সোয়া চারটা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন স্পিকার।

আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৮১ সালে ফিরে আসার পর মান্নানকে ছাত্রনেতা হিসেবে পেয়েছিলাম। ১৯৮৩ সালে তাকে ছাত্রলীগের সভাপতি করি। তখন ছাত্রলীগের খুব দুঃসময় ছিল। 

অনেকেই ছাত্রলীগ ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। সে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিল। তাই পরবর্তীতে তাকে আওয়ামী লীগে নিয়ে আসি। সে আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলো। 

বগুড়ার মত জায়গা ওকে নমিনেশন দিলাম। মান্নান সেখানে থেকে জিতে আসলো। পর পর তিনবার সেখান থেকে সংসদ সদস্য।

অতীত স্মৃতিচারণ করে সংসদ নেতা বলেন, মৃত্যুর দুইদিন আগে আমার সঙ্গে অনেক কথা বললো। আমাদের সেন্ট্রাল কমিটিতে নানক আসলেও সে আসতে পারেনি। বোধহয় মনে একটু দুঃখ ছিল।

 আমি বললাম, আমি তো তোমাদের কাউকে ফেলে দেইনি। তুমি আওয়ামী লীগে ছিলে এবং তোমাকে আমি নমিনেশন দিয়েছি, সংসদ সদস্য হয়েছো। কথা বলার সময় দেখলাম তার শরীরটা একটু খারাপ। 

আমি ওকে বললাম তোমার শরীর মনে হয় ভালো না, তুমি একটু ভালোভাবে চিকিৎসা কর এবং চেকআপ করো। ঠিক তারপরই হাসপাতালে ভর্তি। পরদিন খবরটি পেলাম। এভাবে পরপর তিনজন সংসদ সদস্য আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এটা খুবই কষ্টের।

প্রবীণ নেতা আমির হোসেন আমু বলেন, আবদুল মান্নানের অকাল মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অসম্ভব সাংগঠনিক দক্ষতার পাশাপাশি ক্ষুরধার লেখক ছিলেন তিনি। ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে তিনি বৈরী অবস্থায় দক্ষতার সঙ্গে সারাদেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

আরেক প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ বলেন, ২০০৬ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে সিঙ্গাপুরে পাঠিয়েছিলেন। ছাত্রজীবন থেকে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক, অসম্ভব স্নেহ ও ভালোবাসতাম। সামরিক শাসনবিরোধী প্রতিটি আন্দোলনে রাজপথে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন তিনি। 

সাবেক কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, কৃষকের ঘর থেকে উঠে আসা সন্তান আবদুল মান্নান। ছাত্রলীগকে অত্যন্ত কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দিয়ে শক্তিশালী করেছিল এই কৃষিবিদ নেতা। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময় তাঁকে বুদ্ধি দিয়ে, সাহস দিয়ে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছেন। বগুড়ার মতো জায়গায় তিনবার এমপি হয়েছেন। 

শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন নিবেদীত কর্মী ছিলেন আবদুল মান্নান। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবদুল মান্নান বিপুল ভোটে ভিপি হওয়ায় জেনারেল জিয়া তাঁকে হত্যার জন্য গুন্ডা বাহিনী লেলিয়ে দেয়। 

আবদুল মান্নান ওই হামলায় বেঁচে গেলেও সেখানে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আমৃত্যু বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল আবদুল মান্নান অসম্ভব মেধাবী ও সাহসী রাজনীতিবিদ ছিল।

কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ৫০ বছরের বেশী সময় ধরে আবদুল মান্নানের সঙ্গে আমার পরিচয়। ছাত্রজীবন থেকে ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে আইয়ুববিরোধী, মহান মুক্তিযুদ্ধে এবং ’৭৫ পরবর্তী সময়ে স্বৈরশাসক জিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে ছিলেন আবদুল মান্নান। জিয়া-এরশাদকে কোনদিন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে দেননি এই লড়াকু ছাত্রনেতা।

বিরোধী দলের চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, রাজনৈতিক জীবনে কোন খবরদ্দারী নয়, মানুষকে ভালবেসে তাঁদের হৃদয় জয় করতেন প্রয়াত আবদুল মান্নান। চরম বৈরী এলাকা বগুড়াতেও অসম্ভব জনপ্রিয় নেতা ছিলেন তিনি। মেধাবী, সাহসী ও সুবক্তা হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর পদচারণা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 

সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, অনেকে তাঁকে শক্ত মানুষ ভাবলেও কোনদিন রাগান্বিত হয়ে কথা বলতে দেখিনি। আবদুল মান্নানের অসম্ভব সাংগঠনিক শক্তি ছিল। সাংগঠনিক শক্তি দিয়েই নিজের এলাকাকে আওয়ামী লীগের দুর্গ বানিয়েছেন।

গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, গতানুগতিক নয়, আমৃত্যু আদর্শবাদী ও পরিপূর্ণ রাজনৈতিক সৃজনশীলতা ছিল প্রয়াত আবদুল মান্নানের মধ্যে। তিনি বিরোধী দলকে সমালোচনা করে বক্তব্য রাখতেন, কিন্তু তাঁর মধ্যে ছিল মার্জিত ও সভ্যতার নিদর্শন। দেশাত্মবোধ, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, শেখ হাসিনার নেতৃত্ব থেকে আমৃত্যু তিনি ছিলেন অবিচল। 

গণফোরামের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, ’৭৫ পরবর্তী চরম দুঃসময়ে ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে বলিষ্ট ভ‚মিকা রেখেছেন প্রয়াত আবদুল মান্নান। সারাদেশ ঘুরে বেরিয়ে ছাত্রলীগকে শক্তিশালী করে স্বৈরাচারি জিয়া-এরশাদ বিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করেছেন। 

আপনার মন্তব্য