বালুঘাট নিয়ে একদিনের ব্যবধানে দুই রকম প্রতিবেদন!

13
বালুঘাট নিয়ে একদিনের ব্যবধানে দুই রকম প্রতিবেদন!

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর একটি অবৈধ বালুঘাট নিয়েই এক দিনের ব্যবধানে প্রশাসনের কর্মকর্তারা দুই ধরনের প্রতিবেদন দিয়েছেন। সম্প্রতি বদলি হয়ে যাওয়া জেলা প্রশাসক এসএম আবদুল কাদের দায়িত্বে থাকাকালে তার কাছে এ দুটি প্রতিবেদন দাখিল হয়।

রাজশাহীর পবা ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের ‘সরেজমিন তদন্ত’ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জাহিদ নেওয়াজ এ দুটি প্রতিবেদন দাখিল করেন। রাজশাহীতে নতুন জেলা প্রশাসক হামিদুল হক আসার পর এ বিষয়টি জানাজানি হয়। এ নিয়ে হুলস্থুল চলছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে।

নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, রাজশাহীর চরশ্যামপুর ও চরখিদিরপুর মৌজার ইজারা দেয়া একটি বালুঘাট নিয়ে গত ২৯ এপ্রিল প্রথম প্রতিবেদনটি দাখিল হয় জেলা প্রশাসকের কাছে।

এর পরের দিন ৩০ এপ্রিল আরেকটি প্রতিবেদন দাখিল হয়। প্রথম প্রতিবেদনটি গেছে চরশ্যামপুর ও চরখিদিরপুর বালুমহাল ইজারাদার মেসার্স আমিন ট্রেডার্সের মালিক আজিজুল আলম বেন্টুর বিরুদ্ধে। আর দ্বিতীয় প্রতিবেদনটি গেছে তার পক্ষে।

মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল আলম বেন্টুর বিরুদ্ধে নগরীর বুলনপুর এলাকার আনোয়ার হোসেন নামে আরেকজন বালু ব্যবসায়ী অভিযোগ করে আসছেন, তিনি ইজারাবহির্ভুত এলাকা মধ্যশহর তালাইমারী থেকে বালু উত্তোলন করছেন।

এ নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করেন আনোয়ার। হাইকোর্টেও রিট করেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক এসএম আবদুল কাদের তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পবার ইউএনওকে নির্দেশ দেন।

পবা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নূরুল হাই মোহাম্মদ আনাছ, ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ ও সার্ভেয়ার আজিমুল ইসলামকে দিয়ে সরেজমিন তদন্ত করিয়ে তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রতিবেদন দেন ইউএনও।

প্রথম প্রতিবেদনে বলা হয়, চরশ্যামপুর ও চরখিদিরপুর মৌজার ১২০ একর বালুমহালের ইজারাদার মেসার্স আমিন ট্রেডার্স বালু উত্তোলন করে তালাইমারী পথে বিভিন্ন গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছেন।

ইজারাকৃত শ্যামপুর মৌজার বাইরে পদ্মা নদীতে জেগে ওঠা নতুন চর থেকে বালু উত্তোলন করছে আমিন ট্রেডার্স তা প্রথম তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু পরদিন ৩০ এপ্রিল একই বিষয়ে আরেকটি তদন্ত তৈরি করে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়।

তবে দ্বিতীয় প্রতিবেদনে মধ্যচর থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের এ বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে কৌশল করে লেখা হয়েছে তালাইমারী নামে কোনো মৌজা নেই। কাজলা মৌজা থেকে বালুও উত্তোলন করা হচ্ছে না। কিন্তু কোন স্থান থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে সেটিও কৌশলে দ্বিতীয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বালু ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেনের একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট গত ২৬ জুন রাজশাহীর তালাইমারী এলাকার বালুমহাল বন্ধ করার জন্য রাজশাহীর জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন। আদেশপ্রাপ্তির দুই সপ্তাহের মধ্যে আদালতের আদেশ কার্যকর করা হয়েছে মর্মে তা একটি হলফনামার মাধ্যমে আদালতকে অবহিত করার জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়।

কিন্তু বালুমহালটি বন্ধ না করেই গত ২ জুলাই হাইকোর্টে হলফনামা দিয়েছেন নতুন জেলা প্রশাসক হামিদুল হক। আর এতে দ্বিতীয় তদন্ত প্রতিবেদনটির বক্তব্যই উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রিটকারী আনোয়ার হোসেন।

তিনি বলেন, চরশ্যামপুর ও চরখিদিরপুর থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে না। এই মুহুর্তে চর শ্যামপুর মৌজা থেকে পশ্চিমে তালাইমারী শহীদ মিনার সংলগ্ন পদ্মা নদীর নতুন চর থেকে বালু তোলা হচ্ছে। এলাকাটির নাম রামপুর ও চর বিন্দাদহ। এসব বালু আবার তালাইমারী দিয়েই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আনোয়ারের কথার সত্যতা জানতে শুক্রবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তালাইমারী শহীদ মিনার সংলগ্ন এলাকা থেকেই বালু তোলা হচ্ছে। তবে এলাকাটি আসলে কোন মৌজা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এক দিনের ব্যবধানে দুই ধরনের তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে কথা বলতে পবার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নূরুল হাই মোহাম্মদ আনাছ এবং ইউএনও জাহিদ নেওয়াজের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা ধরেননি।

জেলা প্রশাসক হামিদুল হকও এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে তিনি বলেছেন, হাইকোর্টে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তাতে কী লেখা হয়েছে তা এই মূহুর্তে তার মনে পড়ছে না।

আপনার মন্তব্য