লোকসান তবুও বরেন্দ্রে বাড়ছে আলু চাষ

51

মোফাজ্জল বিদ্যুৎ: গেল কয়েক বছর ধরেই আলুতে লোকসান গুনছেন রাজশাহী অঞ্চলের চাষিরা। তারপরও বরেন্দ্র খ্যাত এই অঞ্চলে আলু চাষের পরিধি ও উৎপাদন বেড়েছে। চাষিদের ভাষ্য, আলুতে যেমন ব্যাপক লাভ, তেমনি লোকসানও। প্রতিবছরই লাভের আশায় চাষে নামছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে বাণিজ্যিক আলুচাষ বেড়েছে। আলু তুলে অনেকেই বোরো আবাদ করছেন। কেউ করছেন ভুট্টা চাষ। চাষে আধুনিক কলাকৌশল প্রয়োগে অধিক ফলন পাচ্ছেন চাষি। আলু তোলার পর পরবর্তী ফসল চাষে কমছে খরচ। আর এ কারণেই ঝুঁকি নিয়ে আলু চাষে নামছেন কৃষক।

এখন বরেন্দ্রের মাঠে মাঠে পরিপক্ক হয়ে উঠেছে আলু। কিছু উঠতেও শুরু করেছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পুরোপুরি আলু উঠে যাবে। এরপরই কৃষক আলু গুদামজাত করবেন। আর এ জন্যই প্রস্তুত হচ্ছে এখানকার কোল্ডস্টোরগুলো।

জেলার মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়নের নুড়িয়াক্ষেত্র এলাকার বাণিজ্যিক আলু চাষি মোবারক হোসেন। প্রায় ১৫ বছর ধরে বাণিজ্যিক আলুচাষ করছেন তিনি। এবার ৫০ বিঘা জমিতে আলুচাষ রয়েছে তার।

এই চাষি জানান, প্রতিবিঘায় আলু উৎপাদন হয় প্রায় ৪ টন। সবমিলিয়ে উৎপাদন খরচ হয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার। তিন বছর আগে আলুচাষ করে পুঁজি হারিয়েছে। গত বছর উঠেছে উৎপাদন খরচ। এবার লাভের আশা দেখছেন তিনি। আলুতে যেমন ব্যাপক লাভ তেমনি ব্যাপক লোকসানও হয়।

এদিকে, বাজারে এখন প্রতিকেজি আলু পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৮ টাকায়। গত দুই মাস ধরে উঠছে আগাম আলু। তবে হিমাগারে আলু আসবে মার্চের শেষদিকে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই ব্যাপক উৎপাদন হওয়ায় কোল্ডস্টোরে জায়গা হচ্ছে না আলুর। ফলে মৌসুমের শুরুতে চাষিরা বাধ্য হচ্ছেন কম দামে আলু বিক্রি করতে।

রাজশাহী জেলা হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ আবু বাক্কার আলী জানিয়েছেন, মোট উৎপাদিত আলুর প্রায় ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ হয় হিমাগারে। জেলায় ২৮টা হিমাগারের প্রত্যেকটিতে গড়ে ১৫ হাজার টন করে প্রায় সোয়া ৪ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা যায় । দেড়শ থেকে ২০০ টাকায় প্রতিবস্তা (৫৫ কেজি) আলু সংরক্ষণ করেন চাষি। গত ডিসেম্বরেই পুরনো হিমাগার থেকে চলে গেছে।

রাষ্ট্রপতি পদকপ্রাপ্ত আলুচাষি জেলার পবা উপজেলার বড়গাছি এলাকার রহিমুদ্দিন সরকার বলেন, কয়েক বছর ধরেই রাজশাহীতে আলু চাষের অনুকূল আবহাওয়া বিরাজ করছে। তাছাড়া উন্নত মানের আলু বীজ ব্যবহার করছেন চাষিরা। আর এতেই বাম্পার ফলন মিলছে। তবে প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণের অভাবে আলুর নায্য দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। তাছাড়া আলু রফতানির উদ্যোগ নিলেও লোকসান কমতো কৃষকের।

বিষয়টি স্বীকার করে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামছুল হক বলেন, এই অঞ্চলের মাটি আলু চাষের উপযোগী। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আধুনিক চাষের কলাকৌশল নিয়ে কৃষকদের পাশে রয়েছেন সবসময়।

তিনি আরো বলেন, আলুর ব্যাপক উৎপাদন হওয়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ উঠে যায়। কৃষক লাভবান না হলেও লোকসান গুনতে হয় না। তাছাড়া আলু তোলার পর বোরো ও ভুট্টা চাষে খরচ কমে আসে। ফলে দিন দিন এই অঞ্চলে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে আলু চাষ।

রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় চলতি ২০১৮-২০১৯ কৃষিবর্ষে আলুচাষ হয়েছে ৬৩ হাজার ২৩ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে রাজশাহীতে ৩৮ হাজার ৯৭১ হেক্টর, নওগাঁয় ২৩ হাজার হেক্টর, নাটোরে ৭৩৭ হেক্টর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক হাজার ৩১৫ হেক্টর।

একযুগ আগে ২০০৬-২০০৭ কৃষিবর্ষে এই অঞ্চলে ৫৩ হাজার ৫২০ হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদন হয় ৭ লাখ ২২ হাজার ৭৫৯ টন। সেইবার রাজশাহীতে ৩৪ হাজার ৪০০ হেক্টরে ৪ লাখ ৮৯ হাজার ২৫৬ টন, নওগাঁয় ১৫ হাজার ৫০০ হেক্টরে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫৬৮ টন, নাটোরে এক হাজার ২৫০ হেক্টরে ১৩ হাজার ৭১০ টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২ হাজার ৩৭০ হেক্টরে ৩২ হাজার ২২৫ টন।

কৃষি দপ্তর আরো জানিয়েছে, এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৯ হাজার ৮৮৮ হেক্টর আলুচাষ হয় ২০১৬-২০১৭ কৃষিবর্ষে। সেইবার উৎপাদন ছিল ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ৩২৫ টন। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৫ হাজার ২৮ আলুচাষ হয় ২০১৫-২০১৬ মেয়াদে। সেইবার উৎপাদন হয় ১৪ লাখ এক হাজার ৬২৯ টন।

এছাড়া, ২০১৭-২০১৮ কৃষিবর্ষে ৬৩ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদন হয় ১৩ লাখ ৮৭ হাজার ১২০ টন। কৃষি দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আলুচাষ বেড়েছে রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে। আর নাটোরে কমেছে।

আপনার মন্তব্য