৬৮ বছর ধরে স্বীকৃতির অপেক্ষায় দেশের প্রথম শহীদ মিনার

12
৬৮ বছর ধরে স্বীকৃতির অপেক্ষায় দেশের প্রথম শহীদ মিনার

এম ওবাইদুল্লাহ: দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছর। বাঙালী জাতি পেয়েছে বাংলায় নিজের মনের ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা। ভাষার জন্য রফিক, সালাম, বরকতের জীবন উৎসর্গের দিন ২১শে ফেব্রুয়ারি পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি। কিন্তু ভাষা শহীদের স্মরণে নির্মিত দেশের প্রথম শহীদ মিনারটি আজো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। কিন্তু কেন? শহীদ মিনারটি কি আদৌ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাবে? ভাষা সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সর্বপরি রাজশাহীবাসীর একটিই প্রশ্ন শহীদ মিনারটি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাবে কবে?

রাজশাহীতেই যে প্রথম শহীদ মিনার তৈরী হয়েছিল তা রাজশাহী ছাড়াও ঢাকার ভাষাসৈনিকরাও সমর্থন করেন। যা তাঁদের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে বুকের রক্ত ঢেলে দেয়ার ইতিহাস একমাত্র বাঙালীরই রয়েছে। এর স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বব্যাপী ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। কিন্তু ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত দেশের প্রথম শহীদ মিনারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আজও মেলেনি। বিভিন্ন সময় এর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি উঠলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন কর্মসূচী পালন করেছে। সর্বশেষ সাংবাদিক সংগঠন ‘রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি’ স্মৃতিস্তম্ভটির রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে অনলাইন ভোটিং কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাতে সহায়তা দেয় রাজশাহীভিত্তিক কমিউনিটি অনলাইন সংবাদপত্র ‘বরেন্দ্র এক্সপ্রেস’। ২০১৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি নিজের ভোট দিয়ে এ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমান।www.barendraexpress.com.bd/firstshahidminar লিংকে গিয়ে প্রায় ১৫ হাজারের বেশি মানুষ এই অনলাইন ভোটিংয়ে অংশ নেয়। এ দাবির পক্ষে দালিলিক প্রমাণ ও ভোটিং লিস্ট প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানোর ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, বিভিন্ন নঁথি ও রাজশাহীর ভাষাসৈনিকদের কাছে জানা যায়, এটিই দেশের প্রথম শহীদ মিনার। তবে বিভিন্ন সময় রাজধানী ঢাকাসহ আরও দুই একটি স্থান থেকে দেশের প্রথম শহীদ মিনার তৈরীর দাবি ওঠে। এ বিষয়ে ২০১৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘বাংলা ট্রিবিউন’ ‘প্রথম শহীদ মিনার ঢাকায় নাকি রাজশাহীতে!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। উদিসা ইসলামের করা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়- “বার বার ভাঙা-গড়ার খেলায় দেশের প্রথম শহীদ মিনার কোথায় হয়েছিল সেটা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়া হয়নি আজও। তবে বিভিন্ন স্থানের ভাষা সৈনিকদের তথ্য বলছে, প্রথম শহীদ মিনার হয়েছিল রাজশাহীতে। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ দিবাগত রাতে রাজশাহী কলেজ ছাত্রাবাস সংলগ্ন এলাকায় এটি তৈরি হয়।

ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ভাঙা-গড়ার বিষয়ে বলতে গিয়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র বদরুল আলম ও সাঈদ হায়দারকে দিয়ে ডিজাইন করিয়ে নেয়া হয়েছিল। কারণ, স্মৃতিস্তম্ভের বিষয়টি বদরুল ছেলেবেলায় তার বাবার কাছে শুনেছিল। তারই আদলে ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি একটা নকশা করে দেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতেই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের নির্মাণ শেষ হলে ২৪ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনার এর উদ্বোধন করেছিলেন ভাষা শহীদ সফিউর রহমানের বাবা।’ যদিও ততক্ষণে রাজশাহীর শহীদ মিনার তৈরি হয়ে সেটা ভেঙেও ফেলা হয়েছে।

২১ ফেব্রুয়ারি গুলি চলার পর রাজশাহী সরকারি কলেজের ছাত্ররা রাতের আঁধারে লণ্ঠন জ্বালিয়ে কলেজ হোস্টেলের মাঠে কাদা দিয়ে ইট গেঁথে বানিয়েছিলেন প্রথম শহীদ মিনার। পরের দিন পুলিশ এসে তা ভেঙে দেয়। পেশায় লেখক ও সাংবাদিক ভাষাসৈনিক সাঈদ উদ্দিন আহমদ এর লেখা থেকে জানা যায়, রাজশাহী মেডিক্যাল স্কুলের সিনিয়র ছাত্র এস এম গাফ্ফারের সভাপতিত্বে সভায় দুটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। তার মধ্যে শহীদ ছাত্রদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ করাটাও একটা। ইট ও কাদামাটি দিয়ে যেভাবেই হোক রাতেই শহীদদের স্মরণে একটি শহীদ মিনার তৈরি করতে হবে বলে সবাই সিদ্ধান্ত নিলো। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক হলেন রাজশাহী কলেজের সিনিয়র ছাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোলাম আরিফ টিপু (বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর)।

সেই রাতের সিদ্ধান্তে একদিনের মধ্যে তৈরি হলো মিনার, লেখা হলো ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’। আর দেয়ালে সেঁটে দেয়া হলো একটি চরণ-‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই। নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান,ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’

সেখানে উপস্থিত গোলাম আরিফ টিপু বলেন, কোথা থেকে একটা ভাঙাচোরা ক্যামেরা এনে সেইদিন ছবিও তুলে রাখা হয়েছিল। এদিকে আমরা সারা রাত জেগে শহীদ মিনারটি নির্মাণ করি। পরদিন সকালে হরতালের পিকেটিং করার জন্য আমরা সবাই হোস্টেল থেকে বেরিয়ে পড়ি। এ সময় পুলিশ এসে শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। আমরা খবর পেয়ে বিকেলে এসে দেখি, পুলিশ শহীদ মিনারটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

এই ভাষা সৈনিককে প্রথম শহীদ মিনারের স্মৃতি নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে আরও বলেন, কে আগে আর কে পরে এটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না, তবে এটা সত্য রাজশাহী কলেজ ছাত্রাবাসের সামনে আমরা একদিনেই শহীদ মিনার তৈরি করে ফেলি। সিদ্ধান্তটা ২১ তারিখেই ছিল। এটাই যে প্রথম শহীদ মিনার সেটা প্রমাণে আমরা কখনও আর এগোয়নি। কিন্তু সঠিকটা জানানোর জন্য ইতিহাসের কিছু দায় থাকে কিনা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, অবশ্যই ইতিহাসের দায় আছে এবং এটাই সত্য যে, সময়ের হিসাব করলে রাজশাহীর শহীদ মিনারটি আগে হয়েছিল।”

এতদিনেও স্বীকৃতি না পাওয়ার বিষয়ে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমান বলেন, আমি মনে করি, এটি আমাদের রাজশাহীবাসীর ব্যর্থতা। আমাদের যারা ভাষাসৈনিক ছিলেন তাদের মধ্যেকার অনেকেই পরলোক গমণ করেছেন। দু-একজন এখনও বেঁচে আছেন। তারপরও শহীদ মিনারটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। আমাদের রাজশাহীর শ্রদ্ধাভাজন রাজনীতিবীদ, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী যারা আছেন তারা যে যৌথ প্রয়াস নিয়ে এগোবে সেটা কখনও হয়ে উঠেনি। সংসদীয় মন্ত্রনালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাগজ, প্রমানাদীর মাধ্যমে স্বীকৃতি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া হয়নি। আমরা দেখিছি শুধুমাত্র সাংবাদিকরাই মাঝেমাঝে এটা নিয়ে নাড়া দেয়। যেমন রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি প্রায় মাস ব্যাপী রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবীতে অনলাইনে ভোটিং কার্যক্রম চালায়। এভাবে যদি সবাই বিভিন্নভাবে এই দাবীটা পেশ করতো তাহলে বিষয়টা ভালভাবে সরকারের দৃষ্টিগোচর হতো।

তিনি আরো বলেন, এই শহীদ মিনারটি কেন্দ্রের (ঢাকা) বাইরে হওয়া স্বীকৃতি না পাওয়ার অন্যতম একটি কারন। শহীদ মিনারটি ঢাকাতে হলে দেখা যেত যে, বিষয়টি নিয়ে একটি কমিটি গঠন হতো। এটার সঠিকতা যাচাই করা হতো। আমরাও কিন্তু সেটিই মনে করছি। আমরা অযৌক্তিক দাবী করছি না। এই রক্তঝরা মাসে এটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হোক এটিই আমরা চাই। অন্তত রাজশাহীবাসীর দাবীর সঠিকতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় থেকে একটি কমিটি গঠন করা হোক।

এ বিষয়ে ভাষা সৈনিক মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ভাই ও মুক্তিযুদ্ধের তথ্যসংগ্রাহক ওয়ালিউর রহমান বাবু বলেন, এই অঞ্চলটা সবসময় বঞ্চিত। শহীদ মিনারটির স্বীকৃতির বিষয়টিও হয়তো বা সেই কারনে কেউ মেনে নিতে পারে না। আমরা এর আগেও বলেছি দেশের যদি আর কোথাও প্রথম শহীদ মিনার হয়ে থাকে তাহলে সঠিকতা যাচাই করে সেটির স্বীকৃতি দেয়া হোক। কিন্তু কেউ সেটা জানাতে পারেনি। দেশের কোথা থেকেও সেই খবর আসেনি। এই স্মৃৃতিস্তম্ভটিকে দেশের প্রথম শহীদ মিনার বা স্মৃৃতিস্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে দাবী জানানো হলেও আজও এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তার অন্যতম একটি কারণ এই অঞ্চল লাল ফিতার দৌরত্বে বঞ্চিত। তিনি আরো বলেন, আমি ভাষা সৈনিকদের থেকে জেনেছি, ঢাকার কোন জায়গায় সেই রাতে শহীদ মিনার নির্মাণের পরিস্থিতি ছিল না। সেদিক দিয়ে বলা যায় এটিই ভাষা শহীদদের স্মরণে দেশের প্রথম স্মৃৃতিস্তম্ভ।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৫১ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টায় শুরু করে রাত ১২টায় শেষ হয় দেশের প্রথম শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ। পরদিন ২২ ফেব্রয়ারি সকালে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে ওই শহীদ স্মৃতি স্তম্ভের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অবশ্য কয়েক ঘণ্টা পরই তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পুলিশ সেটি ভেঙ্গে দেয়।

এদিকে, ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম এই শহীদ মিনারটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানায় ‘চেতনায় একুশ’ নামের একটি সংগঠন। তারা ভাষা সৈনিকদের নিয়ে সে সময় রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই জায়গাটি সংরক্ষণের পাশাপাশি এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান। সে বছরই প্রথম ২১ ফেব্রুয়ারিতে এখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ‘চেতনায় একুশ’সহ রাজশাহীর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। পরবর্তীতে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ও রাজশাহী কলেজ প্রশাসন যৌথভাবে এখানে একটি স্মৃৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে দেন।

পরবর্তিতে রাজশাহী কলেজ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ২০০৯ সালে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির সেই স্থানটিতে একটি ফলক নির্মাণ করা হয়। ফলকটি উন্মোচন করেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন তৎকালীন ও বর্তমান মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে এই স্থানটিতে একটি স্থায়ী শহীদ মিনার তৈরির উদ্যোগও নেয়া হয় ২০১৫ সালে। বর্তমানে শহীদ মিনারটির পুননির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। এর আগে গত বছরের ৩০ অক্টোবর শহীদ মিনারের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেন রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা।

রাসিকের দেয়া তথ্যমতে, সুদৃশ্য এই শহীদ মিনারটির উচ্চতা হবে ভূমি থেকে ৫৫ ফিট। এতে থাকবে তিনটি পিলার। বড় পিলারটির উচ্চতা হবে ৫২ ফিট। এটি হবে সিলভার কালারের। মধ্যম ও ছোট পিলারের উচ্চতা হবে যথাক্রমে ৪০ ফিট ও ৩০ ফিট। মধ্যম ও ছোট পিলার ২টি হবে পোড়ামাটি রঙে। শহীদ মিনারের বেদীতে ইতিহাস ও ঐতিহ্য লিপিবদ্ধ থাকবে।

আপনার মন্তব্য