কিভাবে কাটবে জনসম্মুখে কথা বলার ভীতি?

34

তারুণ্য ডেস্ক: জনসম্মুখে কথা বলতে গিয়ে প্রথমবার গলা জড়িয়ে যায়নি, এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন। কালে কালে এসব লোকই হয়ে উঠেছেন জনপ্রিয় বক্তা।

কিন্তু প্রথম অভিজ্ঞতা সবারই একই। যখনই কানে এসেছে মঞ্চে ওঠার ঘোষণা, তখনই বেড়েছে হৃদস্পন্দন। আর মঞ্চে উঠে হাত-পা কাঁপা বা ঘামতে শুরু করার ঘটনা বিরল নয়।

এর কারণ-ভীতি বা জড়তা। অনেকের মধ্যে জনসম্মুখে কথা বলা নিয়ে এক ধরণের ভীতি কাজ করে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘গ্লসোফোবিয়া’। এই সমস্যাটি এড়ানোর জন্য আত্মপ্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই!

বর্তমান যুগে পাব্লিক স্পিকিং-এর গুরুত্ব বলে শেষ করা সম্ভব না। যেকোনো ক্ষেত্রে এই গুণটি তোমাকে হাজার হাজার প্রতিযোগীর মাঝে অনন্য করে তুলবে। যেকোনো আইডিয়া সবার সামনে তুলে ধরতে কিংবা এক সাথে অনেক মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে হলে পাব্লিক স্পিকিং এ দক্ষতা অত্যাবশ্যক।

তাছাড়া একাডেমিক কাজে প্রেজেন্টেশন দেয়া কিংবা ডিবেট করা, মডেল ইউনাইটেড ন্যাশনস এ অংশ নেয়ার ক্ষেত্রেও এই গুণটির প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করা নিষ্প্রয়োজন। কাজটি যতটা কঠিন মনে হয় আসলে ততটা কঠিন নয়। চাইলে তুমিও হয়ে উঠতে পারো একজন “Elocutionist”!

এ জন্য মনে রাখতে হবে-১।পরিকল্পনা, ২।প্রস্তুতি এবং ৩।চর্চা। 

কিভাবে জনসম্মুখে কথা বলার আত্মবিশ্বাস অর্জন করা যায়?  

পরিকল্পনা

যেকোনো কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো পরিকল্পনা। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া কোনো কাজেই সফলতা অর্জন করা সম্ভব না। তবে শুধু পরিকল্পনা করে থেমে থাকলেই চলবে না, কাজে নামতে হবে সেই অনুযায়ী।  শুরুতে একটি আউটলাইন তৈরি করে নাও বক্তব্যের। 

অর্থাৎ বক্তব্যের শুরুটা কী দিয়ে করবে, মাঝের মূল বিষয়ে কী কী পয়েন্ট থাকবে এবং শেষে উপসংহার কী দিয়ে টানবে।

শুরুতে বিষয় সম্পর্কিত যেকোনো মনীষীর উক্তি কিংবা গল্প দিয়ে শুরু করলে দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। তাছাড়া গুরুগম্ভীর কথার চেয়ে হাস্যরসপূর্ণ কথা শ্রোতাকে বেশি আকৃষ্ট করে। তাই শুরুতে একটি ছোট্ট কৌতুক দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।

অবশ্যই তা মূল বক্তব্যের বিষয়বস্তুর সাথে সম্পর্কিত হতে হবে।  এরপর তথ্য বহুল কিংবা বিশ্লেষণ নির্ভর আলোচনাগুলোকে সাজিয়ে নাও।

তবে মূল তথ্যগুলো সাজানোর সময়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং কম গুরুত্বপূর্ণ অনুযায়ী বাছাই করতে হবে। এরপর অধিক জরুরি তথ্যগুলোকে বক্তব্যের প্রথম দিকে  সাজিয়ে নিতে হবে।

অনেক সময়ে দেখা যায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বক্তা তার পুরো বক্তব্য শেষ করতে পারেন না, অধিক প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো শেষে বলার পরিকল্পনা থাকায়। তাই সময়ের মধ্যে সকল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাতে তুলে ধরার জন্য সেগুলো প্রথমার্ধে বলার চেষ্টা করতে হবে।  

মঞ্চে উঠে আমরা অনেক সময়েই লিখিত বক্তব্যটি ভুলে যাই। এক্ষেত্রে বক্তব্যকে পয়েন্ট আকারে খসড়াভাবে লিখে ফেলতে পারো। পুরো বক্তব্য মনে রাখার চেয়ে পয়েন্ট মনে রাখা বেশি সুবিধাজনক।

খসড়া দেখে দেখে বক্তব্য দেয়া একজন বক্তার অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয়। তাছাড়া এতে শ্রোতা একঘেয়ে বোধ করে। তাই চেষ্টা করতে হবে যথাসম্ভব না দেখে সাবলীলভাবে কথা বলার অভ্যাস করা।

প্রয়োজনে লিখিত পয়েন্টগুলো সামনে রাখা যেতে পারে। এতে ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা এড়ানো যাবে।  তাছাড়া বক্তব্যকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে দর্শকের জন্য কিছু প্রশ্ন টুকে রাখতে পারো কাগজে।

প্রশ্ন করার ফলে দর্শক শুধু একঘেয়েমিভাবে বক্তব্য শুনবে না বরং নিজেরাও চিন্তা করার সুযোগ পাবে। দর্শকের মতামতকে গুরুত্ব দিলে পুরো উপস্থাপনাটি প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

প্রস্তুতি

প্রস্তুতির বিশেষ একটি অংশ হলো গভীরভাবে পড়াশোনা করা। যেই বিষয়ে কথা বলতে হবে, সেই বিষয়টি সম্পর্কে যত গভীরভাবে জানবে ততই তোমার আত্মবিশ্বাস বাড়বে।

তাছাড়া শ্রোতার নানান প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় একজন বক্তাকে। সেক্ষেত্রে ঐ বিষয়ে গভীর জ্ঞান সেসকল প্রশ্নের উত্তর সাবলীলভাবে দিতে সহায়তা করবে।

বক্তব্য যাতে একঘেয়ে না হয়ে যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এ জন্য নির্দিষ্ট ‘রোডম্যাপ’ অনুসরণ করতে হবে এবং একটি সুনির্দিষ্ট গন্তব্য নির্ধারণ করতে হবে। সেই গন্তব্যকে সামনে রেখে বক্তব্য প্রস্তুত করতে হবে। প্রস্তুতির আরেকটি বিশেষ অংশ হলো দেখে দেখে শেখা।

এক্ষেত্রে প্রচুর ভিডিও দেখতে হবে। এমন অনেক ইউটিউবার আছেন যারা বাকপ্টু হিসেবে আদর্শ বলে বিবেচিত হন। তাছাড়া দৈনিক অন্তত একটি করে টেডটকের ভিডিও দেখা এক্ষেত্রে অনেকটা সাহায্য করবে।

ভালো উপস্থাপকের দেহভঙ্গি, স্বরভঙ্গি, শব্দচয়ন ইত্যাদি বারবার করে দেখার ফলে তা নিজের আয়ত্তে আনা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে অন্য বক্তাকে অনুসরণ করতে করতে আপন ব্যক্তিত্ব যাতে হারিয়ে না ফেলি সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

অনুকরণ না করে অনুসরণ করার চেষ্টা রাখতে হবে। অর্থাৎ সেই বক্তার ভালো দিকগুলো বেছে নিয়ে সেগুলো চর্চা করতে হবে তবে অবশ্যই নিজ স্বকীয়তা ধরে রেখে। 

তাছাড়া বক্তব্যের বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বা আগ্রহ প্রকাশ করা ভালো বক্তার লক্ষণ। বক্তা যদি আগ্রহ নিয়ে বিষয়টি তুলে না ধরে, তবে শ্রোতাও আগ্রহ নিয়ে শুনবে না।

এজন্য হাসিমুখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলার অভ্যাস করতে হবে। শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে কোনো ধরণের দ্বিধাগ্রস্থতা প্রকাশ না করে আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলার প্রস্তুতি নিতে হবে।

চর্চা

জনসম্মুখে কথা বলার ভীতি কাটাতে চর্চার কোনো বিকল্প নেই। দেখে দেখে বক্তব্য দেয়া পরিহার করতে হবে। স্লাইড বা কাগজ দেখে বক্তব্য দেয়ার ফলে দর্শক দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

চেষ্টা করতে হবে দর্শকের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে এবং শুধু একদিকে নয় বরং সকলের দিকে সমান দৃষ্টি রেখে কথা বলার।

 এ জন্য সবচেয়ে ভালো উপায়টি হলো, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার অভ্যাস করা। এতে তুমি নিজের দেহভঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তাছাড়া নিজেই নিজের সমালোচক হিসেবে ভুল-ত্রুটি বের করে সেগুলো সমাধানে সচেষ্ট হতে পারবে।

গলার স্বর ঠিক কতটুকু উঠানামা হবে বা চোখের ভাষা ব্যবহার করে কিভাবে প্রাণবন্তভাবে উপস্থাপন করা যাবে এগুলো দেখতে হবে। এতে করে আত্মবিশ্বাসও বৃদ্ধি পাবে। যেকোনো ধরনের নেতিবাচক চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে।

অস্থিরতা কমানোর জন্য হালকা মিউজিক শোনা, দশ মিনিট যোগব্যায়াম করা কিংবা মেডিটেশন করা যেতে পারে। চোখ বন্ধ করে নিজেকে সবার সামনে বক্তব্য দেয়া অবস্থায় কল্পনা করে দেখো। এরপর ঠিক যেইভাবে নিজেকে দেখতে চাও ঠিক সেটাকে লক্ষ্য হিসেবে ধরে প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যাও!    

আমাদের সমাজে ছাত্রদের মধ্যে গ্লসোফোবিয়া অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা। ছোটবেলা থেকে ক্লাসে কথা বলার ভয়ে পেছনের বেঞ্চে লুকিয়ে ছেলে কিংবা মেয়েটি যত বড় হয় ততই বুঝতে পারে যোগাযোগ দক্ষতার গুরুত্ব কত বেশি।

এমনকি চাকরির বাজারে টিকে থাকতে হলে এই গুণটি সর্বাপেক্ষা প্রয়োজন। সবার সামনে কথা বলার ভয়-ভীতি কাটিয়ে রাতারাতি সাবলীলভাবে বক্তব্য প্রদান করার দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর ধৈর্য ধরে এগিয়ে চলার প্রচেষ্টা!

আপনার মন্তব্য