কৈশোরবান্ধব প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা

19
কৈশোরবান্ধব প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা

তারুণ্য ডেস্ক: স্মৃতি আক্তার ‘দুরন্ত মহাখালী ফুটবল’ দল সখী’র একজন গোলকিপার। ২০১৫ সালে তিনি এই ফুটবল দলে যোগ দেন। তার দল ২০১৬ তে চ্যাম্পিয়ন ও ২০১৭ সালে রানার্স আপ হন। থাকেন ঢাকার মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে। বাবা বেকার। তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে স্মৃতি তৃতীয়। ঘর ভাড়ার আয় আর বড় বোনের চাকরির টাকায় সংসার চলে তাদের।

মাসিককালীন স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা সম্পর্কে কিশোরী স্মৃতি আক্তার বলেন, আমার জন্ম এই কড়াইল বস্তিতে। এই বস্তিতেই আমার বেড়ে ওঠা। প্রথম প্রথম মাসিককালীন সময়ে ওড়না কেটে ব্যবহার করতাম। পাকা মেঝের চারদিকে বেড়ার গোসলখানার উপরটা খোলা। একটা গোসলখানা কয়েক পরিবার ব্যবহার করি। প্রথম প্রথম কাপড় ধুয়ে গোসলখানার বেড়ায় মেলে দিতাম। এরপর ব্র্যাক, আমরাই পারি’র সখী প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হই। এই সংস্থার কর্মীদের কাছে জানতে পারি, মাসিককালীন স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা সম্পর্কে। বছর দুয়েক ধরে স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করি। মাসিককালীন সময়ে মাছ, মাংস, ডিম খাওয়া যাবে না এ নিয়ে মা কখনও বলেননি। সবাই যা খেয়েছে আমিও তাই খাই।

নবম শ্রেণীর ছাত্রী রুবিনা আক্তার। পড়েন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ উচ্চ বিদ্যালয়ে। পৈতৃক বাড়ি বরিশালে। থাকেন ঢাকার মিরপুরের ভাসানটেক বস্তিতে। সরকারের জমিতে ঘর তুলে সপরিবারে থাকেন। বাবা রিকশাচালক। মা একটি অফিসে রান্নার কাজ করেন। দুই ভাইবোনের মধ্যে রুবিনা ছোট। বড় ভাই অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।

রুবিনা আক্তারের মতে, মাসিক হয় এ সম্পর্কে আমাকে আম্মু কিছুই বলেননি। আমার কোনো ধারণাই ছিল না। বান্ধবীদের সঙ্গে খেলছিলাম। এক বান্ধবী বলল, তোমার জামায় কি যেন লাইগ্যা আছে। ভয় পেয়ে আম্মুকে বলি। আম্মু বলেন, ‘ভয় পাওয়ার কিছু নাই। এইট্যা স্বাভাবিক ব্যাপার। আমি এইট্যার ব্যবস্থা কইর‌্যা দিমু।’ আম্মু দেখিয়ে দেন। প্রথম প্রথম আম্মুই করে দিতেন।

সখী প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে রুবিনা আক্তার বলেন, আম্মু ২০১৪ সালে আমরাই পারি’র একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এই সংস্থার মাধ্যমে আমি ‘সখী প্রকল্পে’র সঙ্গে যুক্ত হই। ‘সখী প্রকল্পে’র মাধ্যমে জানতে পারি কোন বয়সে আমাদের শরীরের পরিবর্তন হয়। মাসিককালীন সময়ে আমাদের কি কি খাওয়া দরকার। কিশোরী স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে পারি। আমার নিজেরও দশজনের একটি দল রয়েছে। প্রতি মাসে আমরা সভা করি। অভিভাবকরা খেলাধুলা পছন্দ না করায় খেলতে পারি না।

নবম শ্রেণীর ছাত্রী নাবিলা আক্তার সপরিবারে থাকেন ঢাকার শ্যামলী হাউজিং বস্তিতে। পৈতৃক বাড়ি পটুয়াখালী। তিন বছর বয়সে নদী ভাঙনে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। ছেলেবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হওয়ার। কিন্তু অভাবের সংসারে টাকা খরচ করে পড়াশোনা করার সামর্থ্য নেই তার। বাবা গাজীপুরে নিরাপত্তা প্রহরীর চাকরি করেন। মা গৃহিণী। চার বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে নাবিলা সেজ। ‘সখী প্রকল্প’ থেকে ছয় মাসের আরএসই কোর্স করেন। এই কোর্সে বিনা ফিতে ইলেকট্রিক কাজ হাতে কলমে শিখেন। ওর সঙ্গে মিরপুরের প্রত্যেক বস্তির ১৫ জন মেয়ে গার্মেন্ট, কুকার, লেকার পলিশ, সেলাই ইত্যাদি বিষয়ের ওপর ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে ওদের চাকরি দেয়া হয়। নাবিলাও চাকরি পান সাভারে সিঙ্গার কোম্পানিতে। তিন মাস চাকরি করার পর অসুস্থ হলে চলে আসেন ঢাকায়। পড়াশোনার প্রতি অদম্য আগ্রহ থেকেই সুস্থ হয়ে চাকরির পাশাপাশি ভর্তি হন উন্মুক্ত স্কুলে। প্রতি শুক্রবার ক্লাস করেন শেখেরটেক প্রতিভা আইডিয়াল স্কুলে।

মাসিককালীন সময়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পর্কে নাবিলা আক্তার বলেন, প্রথম বুঝতে পারিনি। আপু দেখে আম্মুকে জানায়। আম্মু আমাকে দেখিয়ে দেয়। পুরনো সুতি কাপড় ব্যবহার করতাম। একটি ঘরে অনেক মানুষ থাকি। যাতে কেউ না দেখে তাই ঘরে আলনার পেছনে মেলতাম। এদিকে বাথরুমেও লম্বা লাইন। ২০টি পরিবারের জন্য একটি বাথরুম। এই সময়টা খুব কষ্ট হয়। অভাবের সংসারে এতজন ভাইবোন। সপ্তাহে তিন-চার দিন মাছ খাই। বাকি দিন সবজি-ডাল-ভর্তা। মাসিককালীন সময়ে আম্মু মাছ, ডিম খেতে দিতেন না। এখন জানি এসময় মাছ, মাংস, ডিম পুষ্টিকর খাবার খেতে হয়।

মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের সখী প্রকল্পের ইনফরমেশন ফেসিলিটেটর সেলিনা আক্তার জানান, কিশোরীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে অভিভাবক ও কিশোরীর মধ্যে সমন্বয় দরকার। কিশোরী ও অভিভাবককে সচেতন করতে হবে। যাতে কিশোরীরা তাদের মায়েদের সঙ্গে নিজেদের সমস্যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে। যতদিন পর্যন্ত পরিবারে এই আবহ তৈরি না হবে ততদিন পরিবর্তন করা সহজ হবে না।

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. শাহানা নাজনীনের মতে, অভিভাবকরা জানেন না, তাদের কিশোর-কিশোরীদের প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে কিভাবে ধারণা দিতে হবে। মানবাধিকারের অংশ হিসেবে প্রজনন ও যৌন স্বাস্থ্য বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের সমান অধিকার রয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের আইইএম ইউনিটের পরিচালক মো. ফেরদৌস আলমের মতে, প্রত্যেক কিশোরীর নিরাপদ ও সফলতার সঙ্গে বয়ঃসন্ধিতে উপনীত হওয়ার অধিকার রয়েছে। এই লক্ষ্যে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২৪২টি উপজেলার ২৪২টি স্কুলে ‘কিশোর-কিশোরীদের জন্য প্রজননস্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ রোধ ও পুষ্টি’ বিষয়ক সচেতনতামূলক কর্মশালার আয়োজন করেছে। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এই বিষয়ক সচেতনতা তৈরি করার জন্য ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও এই উদ্যোগটি নেয়া হয়েছিল। কারণ কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতা।

কিশোর-কিশোরীদের উন্নয়নের স্বাথের্, তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও ভবিষ্যত মানোন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সরকার ২০১৭-২০৩০ সাল পর্যন্ত কিশোরী স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে প্রজননস্বাস্থ্য, প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ ইত্যাদি সম্পর্কিত সচেতনতায় গুরুত্ব দিয়েছে। কৈশোরকালীন যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের সুস্বাস্থ্য গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবারকেও সহযোগিতা করতে হবে বললেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

মাসিককালীন সময় কিশোরী-তরুণীরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না থাকলে এবং স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার না করলে কি ধরনের সমস্যা হতে পারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ উইমেন হেলথ কোয়ালিশনের সখী প্রকল্পের প্যারামেডিক শিপ্রা রানী দেবনাথ বলেন, ঢাকার মোহাম্মদপুরে বেড়িবাঁধের বস্তিতে বসবাসকারী অনেক কিশোরী, নারী তাদের প্রজননতন্ত্রের সমস্যাগুলো নিয়ে আমাদের কাছে আসত। কেন সমস্যা হচ্ছে কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে জানার চেষ্টা করি। এসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে- প্রজননতন্ত্রের আশপাশের স্থানগুলোতে চুলকানি, চামড়া ওঠা, লালচে হয়ে যাওয়া, তলপেটে ব্যথা ইত্যাদি।

তাদের কাছে এও জানতে চাই- তারা স্যানেটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে হয় জানে কি না? তাদের মধ্যে অনেকে বলেন, এ সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। এমনকি তারা মাসিককালীন সময় কিভাবে পরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করতে হয় তাও জানেন না। তাদের স্যানিটারি ন্যাপকিন দেখানোর পাশাপাশি এর ব্যবহার করা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয়া হয়। ভিজে না গেলে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যবহারের কথাও বলা হয়। সে সঙ্গে কেউ যদি কাপড় ব্যবহার করতে চান তা কিভাবে পরিষ্কার করতে হবে তাও বলা হয়। এই সময়ে ব্যবহৃত কাপড় গরম পানি, সাবান অথবা ডিটারজেন্ট পানি দিয়ে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে পরিষ্কার স্থানে রাখার পরামর্শও দেয়া হয়।

সূত্র: যুগান্তর

আপনার মন্তব্য