ভার্চুয়াল বিনোদনে ডুবে আছে তারুণ্য

10
ভার্চুয়াল বিনোদনে ডুবে আছে তারুণ্য

তারুণ্য ডেস্ক: তরুণদেরও যে বিনোদন প্রয়োজন, তাঁদেরও যে একটা অবসরজগত আছে, সেই খোঁজ অনেকে রাখেন না৷ শিশুদের জন্য খেলার মাঠের কথা বলা হয়, খোলা আকাশের কথা বলা হয়৷ কিন্তু তরুণরা কোথায় যাবে!

বয়স ১৮ বছর পর্যন্ত হলে শিশু-কিশোর ধরা হয়৷ তাহলে তরুণ কারা? এখন তো ৫০-এও তরুণ৷ তাই তরুণদের একটা বয়সসীমা দরকার৷ ধরা যাক সেটা ১৪ থেকে ৩০৷ প্রশ্ন উঠতে পারে, কিশোর বয়সকে কেন তরুণ বয়সের সীমায় ফেলা হলো? রবীন্দ্রনাথের গল্পের ফটিক চক্রবর্তীর কথা মনে আছে?

ছোট গল্পের সেই মূল চরিত্র ফটিকের বয়স সম্ভবত ১৪ বছরই ছিল৷ তো ফটিক যে বয়সের, সেই বয়সটা বড় জটিল৷ না ঘরের, না পরের৷ শিশুদের মতো আচরণ করলে কেউ মেনে নিতে চায় না, আবার বড়দের মতো আচরণ করলে নাম হয়ে যায় ‘ইঁচড়ে পাকা’৷

তারপরও রবীন্দ্রনাথের ফটিকদের একটা দল ছিল৷ তারা কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বস্তবায়ন করতে পারত৷ কিন্তু সেই ফটিক শহরে গিয়ে কিন্তু পানি ছাড়া মাছ যেরকম, সেই অবস্থায় পড়ে৷ কিশোর ফটিকের জগত হারিয়ে যায়৷

সেই ফটিকরা এখনো আছে৷ বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে মাস্টার্স পাশ করে ঢাকায় এসেছেন সোহেল রানা৷ আত্মীয়ের বাসায় থাকেন৷ হঠাৎ করেই তাঁর জীবন এক নতুন বাঁক নেয়৷ তাঁর স্কুল আর কলেজ জীবনের দিগন্তজোড়া খেলার মাঠ নেই৷ নেই বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো অথবা পাড়ার সেই পাঠাগারে গিয়ে দল বেধে বই পড়ার সুযোগ৷

সোহেল ঢাকায় একটা চাকরিও পেয়েছেন৷ আরো ভালো বেতনের চাকরি খুঁজছেন৷ কিন্তু তারপরও তাঁর অবসর থাকে৷ তিনি বলেন, ‘‘আমি ঢাকায় কোথায় খেলার মাঠ পাবো? আর এখানে তেমন বন্ধু বান্ধবও নেই৷ বলতে পারেন আমি এখন বিনোদনবঞ্চিত৷ যেটুকু বিনোদন তা ফেসবুক, ইউটিউব আর টেলিভিশন দেখা৷ আর এসবই এখন মোবাইল ফোনভিত্তিক৷ মোবাইল ফোনই যেন এখন আমাদের বিনোদন৷”

এক সময় ঢাকা শহরে পাড়াভিত্তিক অনেক পাঠাগার ছিল৷ ছিল ব্যায়ামাগার৷ অনেক ক্লাব ছিল৷ তা-ও হারিয়ে গেছে৷ একসময় পুরো ঢাকায় সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মোট ২৩টি পাঠাগার ছিল৷ বর্তমানে তা কমে ৭টিতে নেমে এসেছে৷ সেগুলোও নিয়মিত খোলে না৷ পাঠকও নেই তেমন৷ নতুন বই কেনা হয় না বহুদিন৷

দুই সিটি কর্পোরেশন মিলিয়ে এখনো কাগজে-কলমে ২৩টি ব্যায়ামাগার আছে৷ এর মধ্যে ২১টিই দক্ষিণ সিটিতে৷ কিন্তু ব্যায়ামাগারগুলো নামেই আছে৷ নেই প্রশিক্ষক, নেই আধুনিক শরীরচর্চার সরঞ্জাম, নেই পরিবেশ৷ ভবনগুলো পুরোনো, জরাজীর্ন৷ আর ঢাকার ক্লাব বলতে আছে শুধু পরিচিত কিছু ফুটবল ক্লাব৷ যেসব ক্লাবে আগে নানা ধরনের খেলা ও বিনোদনমূলক আয়োজন হতো তা হরিয়ে গেছে৷

ঢাকা মহানগরীর ৬৪ শতাংশ স্কুলে খেলাধুলার কোনো ক্লাসই নেয়া হয় না৷ বেশিরভাগ স্কুলেই খেলার মাঠ নেই৷ রাজউক এবং ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের হিসাব অনুযায়ী রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকারি জায়গায় প্রতিষ্ঠিত পার্ক ৪৭টি৷ কিন্তু বাস্তবে অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় বড়জোর ১০টি, সেগুলোও নানা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে৷ আর ১৯টি খেলার মাঠের মধ্যে ৮টি কোনোমতে টিকে আছে৷ বাকিগুলো বেদখল হয়ে গেছে নগর কর্তৃপক্ষের লোকজনের চোখের সামনেই৷

এর বিপরীতে এখন ঢাকায় গড়ে উঠেছে স্নুকার ও বিলিয়ার্ড ক্লাব৷ আছে সাইবার ক্যাফে৷ আছে ফাস্টফুড আর ফুডকোর্টের আধিক্য৷ আছে কর্পোরেট জিমনেশিয়াম৷ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাব কালচার আছে৷ ডিবেটিং ক্লাব, সায়েন্স ক্লাব, বিজনেস ক্লাব, পর্যটন ক্লাব আছে৷ আছে চলচ্চিত্র সংসদ৷ তবে তা নামকরা ও হাতে গোনা কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে৷ এছাড়া শহরজুড়ে পাড়ায় পাড়ায় রয়েছে ভিডিও গেমের ব্যবসা৷ শপিংমলগুলোতে গড়ে উঠছে সিনেপ্লেক্স৷

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির সপ্তম সেমিস্টারের ছাত্র নাদিম হোসেন রোহান বলেন, ‘‘আমার বাসা গেন্ডারিয়া৷ ধানমন্ডিতে ক্লাস করে আমি বাসায় চলে যাই৷ কিন্তু গেন্ডারিয়া এলাকায় কোনো খেলার মাঠ নেই৷ তাই ঘরেই বসে থাকি৷আমার বিশ্ববিদ্যায়েও খেলার মাঠ নেই যে খেলবো৷ বাসায় মোবাইল ফোনেই আমার বিনোদন৷ ফেসবুক, ভিডিও গেমে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি৷ মাঝে মাঝে বন্ধুরা মিলে ফাস্টফুড সেন্টারে আড্ডা দেই৷”

তিনি আরো বলেন, ‘‘ঢাকার অভিজাত এলাকায় বিলিয়ার্ড ও স্নুকার ক্লাব আছে৷ ওখানে যারা যায়, তাদের অধিকাংশই উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তান৷ তাছাড়া ওখানকার পরিবেশ নিয়েও নানা কথা আছে৷”

ইদানীং তরুণদের একাংশের মাঝে শিশা বারের দিকেও ঝোঁক দেখা যাচ্ছে৷ সেখানে আছে আয়েশি ধূমপানের ব্যবস্থা৷ আর কিশোরদের জন্য আছে ভার্চুয়াল গেমের কর্নার৷ ফাস্ট ফুডের দোকানের সঙ্গেই এগুলোর অবস্থান৷ আর সেইসব প্লে-জোনে ভার্চুয়াল কিশোররা বন্দুক চালানো বা কার ড্রাইভিংয়ের মতো গেমসে অভ্যস্ত হচ্ছে৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটির সাবেক সভাপতি বিপ্লব মোস্তাফিজ বলেন, ‘‘ব্যায়ামগার নেই, আছে জিম৷ আর এই জিমনেশিযাম এখন কর্পোরেট বাণিজ্যের অংশ৷ তরুণরা সেখানে যেতে পারেন না৷ তাঁদের এত টাকা নেই৷ তবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এখনো তরুণদের বই পড়ানোর জন্য কাজ করছে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় কম৷ সিনেমা হল এখন একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে৷ তার পরিবর্তে হচ্ছে সিনেপ্লেক্স, যার টিকেটের দাম অনেক৷”

তিনি আরো বলেন, ‘‘তরুণদের বিনোদনের জন্য সামাজিক উদ্যোগ এখন আর নেই৷ আগে পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব ছিল৷ দাবা খেলা হতো৷ ফুটবল আর ক্রিকেট খেলা হতো৷ নাটক, থিয়েটারের ব্যবস্থা ছিল৷ আয়োজন করা হতো নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের৷ তরুণরা অংশ নিতো৷ আয়োজন করতো৷ অনেক সামাজিক উদ্যোগ তাঁদের মাধ্যমেই হতো৷ কিন্তু এখন আর হয় না৷ তখন নানাভাবে নেতৃত্ব গড়ে উঠত, উদ্যোক্তা বেরিয়ে আসতো৷ এখন এর বিপরীতে বাড়ছে নেশার জগত৷”

বিপ্লব মোস্তাফিজ বলেন, ‘‘এখনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিল্ম সোসাইটি আছে৷ ডিবেটিং ক্লাব আছে৷ কিন্তু সেখানে প্রাণচাঞ্চল্য নেই৷ সবখানেই যেন কর্পোরেট ছোয়া৷”

তাঁর মতে, ‘‘এখন আমাদের জনসংখ্যার ১৪ থেকে ৩০ বছর বয়সিই ৩০ ভাগ, কিন্তু তাদের দিকে তেমন নজর দেয়া হচ্ছে না৷ একটি প্রজন্ম এখন মোবাইল ফোন, ফেসবুক, ইউটিউবে তাদের অবসর কাটায়৷ তারা যেন ভার্চুয়াল জগতের বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে৷ কেউ কেউ ধুলোমাটি ছেড়ে যেন এখন কল্পলোকে বাস করেন৷ পাঠাভ্যাস কমে যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক৷”

তারপও কিছু তরুণ আছেন, যাঁরা নিজেদের বিনোদনের জগত নিজেরাই তৈরি করে নিচ্ছেন৷ তাঁরা সাইক্লিং করছেন, গড়ে তুলছেন বাইকার গ্রুপ৷ আবার দলবেঁধে পর্যটনের প্রতি আগ্রহও বাড়ছে তরুণদের৷ বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ পর্যটনে তাঁদের আগ্রহ ক্রমশই বাড়ছে৷ তরুণরা নিজেরা এক হয়ে জনসেবামূলক কাজও করছেন৷ বঞ্চিতদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন৷

বিয়ে বাড়ির উদ্বৃত্ত খাবার সংগ্রহ করে কেউ কেউ পৌঁছে দিচ্ছেন অভুক্তদের মাঝে৷ তরুণদের অনেকে উদ্যোক্তা হতেও দলবেঁধে কাজ করছেন৷ শুধু প্রয়োজন তাদের একটু জায়গা, সুস্থ বিনোদনের একটু সুযোগ৷ প্রয়োজন ভার্চুয়াল জগত থেকে বাস্তব পৃথিবীতে নামিয়ে আনা৷ বন্ধুরা যেন শুধু ফেসবুকবাসী না হয়, তারা যেন বাস্তবের বন্ধু হয়, ভালোবাসার মানুষ হয়৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. নুরুন্নবী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘১৪ থেকে ৩০ বছর বয়সের এই যে তরুণরা, তারা না ঘরকা না ঘাটকা৷ অথচ তারাই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট-এর জন্য সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময়৷ তারা না শিশুদের নিয়ে পরিকল্পনায় আছে, না আছে তরুণদের নিয়ে পরিকল্পনায়৷ ১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু৷

কিন্তু বাস্তবে ১৪ থেকে কৌশোর৷ আবার তরুণ মানে ৩৫৷ তাহলে এরা যাবে কোথায়? এরা ডেমোগ্রাফিক ওয়েস্টেজে পরিণত হচ্ছে৷ তাদের যদি বিনোদন থেকে শুরু করে সব ধরনের পরিকল্পনায় না আনা যায়, তাহলে আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট ঘরে তুলতে পারবো না৷”

আপনার মন্তব্য